চীনের ঋণে তিস্তায় নতুন স্বপ্ন

News24

অনলাইন ডেস্ক

চীনের ঋণে তিস্তায় নতুন স্বপ্ন
সংগৃহীত ছবি
দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা, কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং ভারতের সঙ্গে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি ঝুলে থাকার বাস্তবতায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় সংসদে ঘোষণা দিয়েছেন, জাতীয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ‘যেকোনো মূল্যে’ তিস্তা ব্যারাজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।

একই সময়ে পানিসম্পদমন্ত্রী জানিয়েছেন, চীনের কারিগরি সহায়তায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরেই এই প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প ঘিরে উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা যেমন নতুন গতি পেয়েছে, তেমনি এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি, পানি কূটনীতি এবং চীন-ভারত নতুন মাত্রা।

প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেন, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের মানুষের দীর্ঘদিনের পানির সংকট নিরসনে সরকার বদ্ধপরিকর। পদ্মা ও তিস্তা দুই নদীকেই বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বর্ষার অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ এবং শুষ্ক মৌসুমে কৃষকদের সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।

এই ঘোষণার এক দিন আগেই জাতীয় সংসদে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি জানান, চীনের কারিগরি সহায়তায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরেই তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হবে। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরের সময় দেশটির প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং এবং পানিসম্পদমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে প্রকল্পে সহযোগিতার বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। এরই মধ্যে দুই দেশের বিশেষজ্ঞরা সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজও শুরু করেছেন।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ‘কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন অব তিস্তা রিভার প্রজেক্ট’ বা তিস্তা মহাপরিকল্পনার প্রথম ধাপ বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯ হাজার ১৫০ কোটি টাকা।
এর মধ্যে প্রায় ছয় হাজার ৭০০ কোটি টাকা চীনের কাছ থেকে ঋণ হিসেবে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বাকি অর্থ বহন করবে বাংলাদেশ সরকার।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের সমীক্ষা করেছে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পাওয়ার চায়না। পরিকল্পনা কমিশনও প্রাথমিক ব্যয়কে যৌক্তিক শর্তে অনুমোদন দিয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে (ইআরডি) চীনের সঙ্গে ঋণ আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে। সরকারের আশা, চলতি বছরের মধ্যেই দুই দেশের মধ্যে আর্থিক চুক্তি সই হতে পারে।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা শুধু নদী শাসনের প্রকল্প নয়, এটি উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রা বদলে দেওয়ার একটি সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১১০ কিলোমিটার নদী শাসন, ১১০ কিলোমিটার ড্রেজিং, ২২৪ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, ৬৭টি গ্রোয়েন নির্মাণ ও সংস্কার এবং প্রায় ১৭০ বর্গকিলোমিটার ভূমি পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি নদীর দুই তীরে সড়ক, পরিকল্পিত নগর, পর্যটন সুবিধা এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।

সরকারের হিসাব অনুযায়ী, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তিস্তা ও ধরলা অববাহিকার প্রায় দুই কোটি মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে। নদীভাঙন কমবে, শুষ্ক মৌসুমে সেচের পানি নিশ্চিত হবে, বন্যা নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে এবং নতুন কৃষিজমি সৃষ্টি হবে।

এই প্রকল্পটি শুধু উন্নয়ন নয়, আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। অতীতে ভারতও তিস্তা প্রকল্পে অর্থায়নের আগ্রহ দেখিয়েছিল। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার আবারও চীনের ঋণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে বিষয়টি আরো একধাপ এগিয়ে যায়।

এদিকে তিস্তা প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা নিয়ে ভারতের উদ্বেগের বিষয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতা কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয় এবং এ বিষয়ে অন্য কারও হস্তক্ষেপও কাম্য নয়। চীন জানিয়েছে, বাংলাদেশের উন্নয়ন কৌশলের অংশ হিসেবে পানি ব্যবস্থাপনা ও জীবিকাভিত্তিক প্রকল্পে সহযোগিতা আরো সম্প্রসারণে তারা প্রস্তুত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটি উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হলেও শুধু অবকাঠামো নির্মাণে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পর্যাপ্ত পানি নিশ্চিত করতে ভারতের সঙ্গে পানিবণ্টন চুক্তিরও বিকল্প নেই। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে পরিবেশ, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে পানিসম্পদ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত বলেন, ‘তিন কারণে বাংলাদেশে তিস্তা প্রকল্পটি খুব দরকার। এক. বর্ষার সময় তিস্তা অববাহিকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা। দুই. বর্ষার আগে-পরে নদীর ভাঙন কমানো। তিন. শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানির প্রবাহ বাড়ানো।’ তিনি বলেন, ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রচুর টাকা দরকার। যারা এগিয়ে আসবে, সরকার সব দিক বিবেচনায় তাদের কাছ থেকেই ঋণ নেবে। চীন শুধু অর্থ নয়, প্রযুক্তি নিয়ে আসবে।’ তবে তিনি মনে করেন, তিস্তা প্রকল্পে চীন যেকোনো ধরনের কারিগরি কাজ করুক না কেন, ভারত না দিলে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পানিপ্রবাহ বাড়বে না। ভারতের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে এর সমাধান করতে হবে।

পাউবো বলছে, প্রকল্পের আওতায় গ্রোয়েন (বাঁধ) নির্মাণ ও তীর প্রতিরক্ষা কাজের মাধ্যমে নদীভাঙন রোধ হবে। বাঁধ নির্মাণ ও মেরামতকাজের মাধ্যমে বন্যার ঝুঁকি কমবে। ড্রেজিংয়ের (খনন) মাধ্যমে নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ ও নদী পুনরুদ্ধার করা হবে এবং শাখা নদীগুলোর নাব্যতা রক্ষা করা হবে।

সূত্র: কালের কণ্ঠ

Source: https://www.news24bd.tv/details/288670?shem=dsdf,sharefoc,agadiscoversdl,,sh/x/discover/m1/4

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here