![]()

দীর্ঘ ১৭ বছর পর বড় ব্যবধানে জয়ের পর দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের পথে হাঁটছে বিএনপি সরকার। প্রশাসকের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনার সমালোচনা এড়াতে এবং গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে চলতি বছরের শেষ দিকে অর্থাৎ নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যে ধাপে ধাপে উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করছে সরকার। এরই মধ্যে ‘স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) সংশোধন বিল-২০২৬’ পাসের মাধ্যমে দলীয় প্রতীক বাতিল করা হয়েছে, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মেরুকরণ তৈরি করেছে।
সরকার চলতি বছরের শেষ নাগাদ স্থানীয় সরকার নির্বাচনের একটি রোডম্যাপ নিয়ে এগোচ্ছে। মূলত এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কথা বিবেচনায় রেখেই এই নির্বাচনী পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। বর্তমানে এসএসসি পরীক্ষা চলমান এবং জুন-জুলাই মাসে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যার ফলে এই সময়ের মধ্যে ভোট গ্রহণ করা সম্ভব নয়। এছাড়া জুন-জুলাই মাসের তীব্র দাবদাহ এবং আগস্ট-সেপ্টেম্বরের বর্ষা মৌসুমও নির্বাচন আয়োজনের জন্য অনুকূল নয় বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।
সব দিক বিবেচনায় রেখে চলতি বছরের নভেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচন আয়োজনের প্রাথমিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে সরকার ধাপে ধাপে এগোনোর পরিকল্পনা করছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ধাপে উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনের আয়োজন করা হবে। এর পরবর্তী ধাপে দেশের ১২টি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের পরিকল্পনা রয়েছে এবং সর্বশেষ পর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সম্পন্ন করার প্রাথমিক পরিকল্পনা রয়েছে।
জাতীয় সংসদে সম্প্রতি ‘স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) সংশোধন বিল-২০২৬’ পাস হয়েছে। এই নতুন সংশোধনী অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো দলীয় প্রতীক ব্যবহার করা যাবে না। এর ফলে রাজনৈতিক দলের নেতারা আর দলীয় প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না; বরং তাদের স্বতন্ত্র প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে হবে।
এই বিষয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকা পোস্টকে বলেন, এই মুহূর্তে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সরকার ভাবছে না।
একক প্রার্থী নির্ধারণে চ্যালেঞ্জে বিএনপি
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপির জন্য একক প্রার্থী নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি পাস হওয়া নতুন বিল অনুযায়ী নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকায় এবং দল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী মনোনয়নের সুযোগ না থাকায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা না হলেও অনেক নেতাকর্মী এরই মধ্যে ব্যানার-ফেস্টুন টাঙিয়ে নিজ নিজ এলাকায় প্রার্থিতার জানান দিচ্ছেন এবং জেলা-উপজেলা পর্যায় থেকে একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী কেন্দ্রে তাদের আগ্রহের কথা জানাচ্ছেন।
বিগত ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকায় এবং নেতাকর্মীরা নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হওয়ায় তাদের ওপর অতিরিক্ত কঠোর হওয়াও দলের জন্য সহজ হবে না বলে মনে করছেন দলটির শীর্ষ নেতারা।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিএনপি প্রতিটি এলাকায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শুরু করেছে। এছাড়া সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নতুন কমিটি গঠনেরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী সাইয়েদুল আলম বাবুল বলেন, নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা দল থেকে এখনও না এলেও মাঠপর্যায়ে নেতাকর্মীরা নিজ নিজ এলাকায় সক্রিয় রয়েছেন।
তিনি বলেন, অনেকেই ইতোমধ্যে নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিয়েছেন এবং কে কোন পদে লড়তে চান, তা জানান দিচ্ছেন। আশা করি, কেন্দ্র থেকে যে সিদ্ধান্ত আসবে, সেটি সম্ভাব্য প্রার্থীরা মেনে নেবেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলের স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, একাধিক প্রার্থীর বিষয়টি ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়ে গেছে। আমার কাছে যারাই আসছে, তাদেরকে বলছি, সবাই প্রার্থী হলে নিজেদের অবস্থানই দুর্বল হবে আর এর সুযোগ নেবে প্রতিপক্ষ। সুতরাং দল যাকে সমর্থন দেবে, সেটা মেনে নিতে হবে। কতজন সেটা মানবে, এই মুহূর্তে তা বোঝা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, দলীয় প্রতীক না থাকায় কাউকে বহিষ্কার করাও সহজ হবে না। ফলে শুধু প্রার্থী হওয়ার কারণে কাউকে বহিষ্কার করলে সমালোচনার মুখে পড়তে হতে পারে। তবে আমাদের লক্ষ্য যেকোনো মূল্যে একক প্রার্থী নিশ্চিত করা।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা সব সময় স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পক্ষে আছি। আমরা হাসিনা মার্কা ভোটারবিহীন নির্বাচনের পক্ষে নই; আমরা চাই স্থানীয় সরকারে নিরপেক্ষ ভোট হোক। সে কারণেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক বাতিল করে সংসদে বিল পাস করা হয়েছে। এর ফলে দেশে আর কোনো ‘ফ্যাসিস্ট’ পরিস্থিতি তৈরি হবে না।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, সরকার এই নির্বাচন আয়োজনে যথেষ্ট আন্তরিক। চলতি বছরের শেষ নাগাদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এর আগে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা এবং প্রতিকূল বর্ষা মৌসুম নির্বাচনী প্রক্রিয়ার পথে বড় অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। এসব কারণে বছরের শেষ দিকে নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপির বেশ কয়েকজন প্রার্থীর নাম বর্তমানে আলোচনায় রয়েছে। একইসঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ইতোমধ্যে ঢাকার দুই সিটিসহ মোট পাঁচটি সিটিতে তাদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে এবং জামায়াতে ইসলামীও দ্রুতই প্রার্থী ঘোষণা করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী
আব্দুস সালাম : তিনি বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
হাবিব উন নবী খান সোহেল : দলের যুগ্ম মহাসচিব এই পদের জন্য অন্যতম শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে এগিয়ে আছেন।
ইশরাক হোসেন : মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং ২০২০ সালের নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী ইশরাক হোসেনও তার ভেরিফাইড ফেসবুক পেজের মাধ্যমে এই সিটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
বিএনপির একটি সূত্র জানায়, ঢাকা দক্ষিণে প্রার্থী হিসেবে হাবিব উন নবী খান সোহেল এগিয়ে আছেন। কারণ তিনি জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন পাননি এবং কোথাও প্রশাসক হিসেবেও নিয়োগ পাননি।
প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দল যেখানে যে দায়িত্ব দেবে, আমি তা পালন করতে প্রস্তুত। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে দল থেকে কোনো নির্দেশনা পাইনি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটির বর্তমান প্রশাসক আব্দুস সালামকে আগামী নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী করার দাবি জানিয়ে বিভিন্ন এলাকায় ব্যানার-পোস্টার দেখা গেছে।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে বর্তমানে তিনজনের নাম জোরালোভাবে আলোচনায় রয়েছে। তারা হলেন, ডিএনসিসির বর্তমান প্রশাসক ও যুবদল নেতা শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও বাফুফে সভাপতি তাবিথ আউয়াল এবং যুবদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মামুন হাসান।
মামুন হাসান ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাকে দল থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। দল থেকে যদি মনোনয়ন দেয়, তাহলে আমি প্রার্থী হবো।
এদিকে নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে দলের ভেতরে ভিন্নমতও রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির একজন যুগ্ম মহাসচিব বলেন, আমার মনে হয় বর্তমানে যারা প্রশাসক হিসেবে আছেন, তারা কেউ নির্বাচনে মনোনয়ন পাবেন না। কারণ তাদেরকে পুরস্কার হিসেবেই প্রশাসক করা হয়েছে। যদিও একদিন সালাম ভাই (দক্ষিণ সিটির প্রশাসক) আমাকে বলেছেন, চেয়ারম্যান (প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান) নাকি তাকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার বিশেষ পরিস্থিতিতে চারটি অধ্যাদেশ জারি করে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনে। ওই সময় জনপ্রতিনিধিদের একটি বড় অংশ আত্মগোপনে চলে যাওয়ায় ১২টি সিটি কর্পোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা, ৬১টি জেলা পরিষদ এবং ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ ভেঙে দিয়ে সেখানে প্রশাসকের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করা হয়। তবে ইউনিয়ন পরিষদের কাঠামোটি বহাল রাখা হয়েছিল; কেবল যেসব ক্ষেত্রে চেয়ারম্যান অনুপস্থিত ছিলেন, সেখানে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। ক্ষমতা গ্রহণের কয়েক দিনের মধ্যেই সরকার দেশের ১২টি সিটি কর্পোরেশন ও ৫৪টি জেলা পরিষদে নতুনভাবে প্রশাসক নিয়োগ দেয়।
Source: https://www.dhakapost.com/politics/448728








