অন্যরা লাভে, দেনায় ডুবছে ইন্টারকন্টিনেন্টাল

বছরের পর বছর লোকসানে থাকা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকার ঋণের দায় নিচ্ছে সরকার। অগ্রণী ব্যাংকের কাছে হোটেলটির মালিকানা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেডের (বিএসএল) চূড়ান্ত দেনা ৮৮৪ কোটি ৪০ লাখ ৪৮ হাজার ৫০১ টাকা। এই ঋণ সরকার বিএসএলের পক্ষে পরিশোধ করবে।

সরকার অগ্রণী ব্যাংককে যে অর্থ পরিশোধ করবে, তা পরবর্তী সময়ে করপোরেট সুকুক, বন্ড ও ইকুইটি ইস্যুর মাধ্যমে ৫০০ কোটি টাকা বিএসএলের কাছ থেকে আদায় করবে। বাকি ৩৮৪ কোটি ৪০ লাখ ৫০ হাজার টাকার বিপরীতে চলতি অর্থবছরের মধ্যে সরকারের অনুকূলে সমমূল্যের সাধারণ শেয়ার ইস্যু করবে বিএসএল। একই সঙ্গে অগ্রণী ব্যাংকের কাছে বন্ধক রাখা বিএসএলের সম্পদ দায়মুক্ত করার ব্যবস্থা নেবে সরকার।

সম্প্রতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ইন্টারকন্টিনেন্টালের ঋণ পরিশোধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ। তবে
এখনও বাজেট থেকে অর্থ ছাড় করা হয়নি। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

সমকালের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে বিএসএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান ভূঁঞা ঋণ পরিশোধের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি কথা বলতে চান না।

বেসরকারি খাতের পাঁচতারকা অন্য হোটেল লাভে থাকলেও ইন্টারকন্টিনেন্টালের ১০ বছরের বেশি সময় ধরে লোকসানে থাকার কারণ জানতে চাইলে বিএসএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, প্রতিষ্ঠানটিকে লাভজনক করতে আগে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখনও তা অব্যাহত রয়েছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে বিএসএল পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন সচিব ফাহমিদা আখতারের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমকাল। ফাহমিদা আখতারের মোবাইল ফোনে এসএমএস করে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চাইলে সাড়া পাওয়া যায়নি।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলস গ্রুপের (আইএইচজি) সঙ্গে ২০১২ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি ৩০ বছর মেয়াদি হোটেল পরিচালনা চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে ‘ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকা’ পরিচালিত হচ্ছে। চুক্তির শর্তানুসারে, ইন্টারকন্টিনেন্টালের ব্র্যান্ড স্ট্যান্ডার্ড অর্জনের জন্য মূল অবকাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে ভৌত, ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল, সাজসজ্জাসহ সব ধরনের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা প্রতিস্থাপন করে ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সময়ে এর সংস্কার হয়।

সংস্কারকাজের জন্য অগ্রণী ব্যাংক থেকে ৫৭৪ কোটি টাকা বাণিজ্যিক ঋণ নেয় বিএসএল। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে নতুন করে চালু হওয়ার পর থেকে হোটেলটি আর মুনাফায় ফিরতে পারেনি। লোকসানে থাকার কারণে তারা ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না।

অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জ্বালানি-বিদ্যুৎসহ নানা কারণে সরকার আর্থিক চাপে রয়েছে। এ অবস্থায় এ ধরনের কাজে অর্থ ব্যয় করার সক্ষমতা সরকারের নেই। কিন্তু অগ্রণী ব্যাংক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তা ফেরত পাচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়েই সরকারকে এই পথে হাঁটতে হচ্ছে।

তাদের মতে, সরকারের দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ভুল সিদ্ধান্তের কারণেই এই পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। শুধু বিএসএল নয়, অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান দিন দিন সরকারের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি করছে। ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলকেও অনেক আগেই বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত ছিল।

মতামত জানতে চাইলে সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ সমকালকে বলেন, ইন্টারকন্টিনেন্টালসহ এ ধরনের প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত। সরকারি পর্যায়ে এগুলো পরিচালনা করে লাভ করা খুবই কঠিন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেডের পরিচালনা পর্ষদে সরকারি লোকজন রয়েছেন। সরকারের আর্থিক বিষয় দেখার জন্য সরকারের একজন প্রতিনিধি বোর্ডে থাকতে পারেন। কিন্তু এগুলোর পরিচালনা বেসরকারি খাতে দিয়ে দেওয়া উচিত। পরিচালনা ও ব্যবসাসংক্রান্ত বিষয়ে বেসরকারি খাতের যারা হোটেল পরিচালনায় দক্ষ ও অভিজ্ঞ, তাদের নিয়ে আসা উচিত।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে নানামুখী অর্থনৈতিক সংকট রয়েছে। এর মধ্যে ৮৮৪ কোটি টাকার এ ধরনের ব্যয় মেটানো সরকারের পক্ষে কঠিন। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিশোধ করা ঋণ সাধারণত ফেরত আসে না।

১০ বছর লোকসানে ইন্টারকন্টিনেন্টাল
ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকার মালিকানায় রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ সার্ভিসেস লিমিটেড (বিএসএল), যা ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত। ডিএসইতে দেওয়া কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটির নিট লোকসান হয়েছে ৮৭ দশমিক ৩৮ কোটি টাকা। এর আগের চার অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি লোকসান করেছে যথাক্রমে– ৭৯ কোটি, ৮৬ কোটি, ১১১ কোটি ও ১৮০ কোটি টাকা। এর আগের পাঁচ বছরও প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন পরিমাণে লোকসান করেছে। ২০২৫ সালের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘ মেয়াদে লোকসান জমতে জমতে কোম্পানিটির মোট সঞ্চিত লোকসানের পরিমাণ ৭০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠানটির সাম্প্রতিক ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরেও লোকসানের ধারা অব্যাহত রয়েছে।

দেশের একই ধরনের হোটেল ওয়েস্টিন এবং শেরাটন ঢাকার মালিকানায় রয়েছে ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টস নামে একটি কোম্পানি। ডিএসইতে দেওয়া আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কোম্পানিটির নিট লাভের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৫২ কোটি টাকা। এর আগের দুই অর্থবছরে কোম্পানি লাভ করেছে যথাক্রমে– ১৫১ কোটি ও ১৮৯ কোটি টাকা। সাম্প্রতিক সময়েও এ দুই হোটেলের ব্যবসা ভালো অবস্থায় রয়েছে।

ওয়ার্ল্ড প্রপার্টি জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক হোটেল শিল্প কভিডের পর ঘুরে দাঁড়িয়েছে, যদিও গতি কম। তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে রেভপার (প্রতি উপলব্ধ কক্ষে আয়) বেড়েছে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ। তবে বিলাসবহুল হোটেলের লাক্সারি শ্রেণিতে বেড়েছে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ।

পুঁজিবাজার থেকে ৫০০ কোটি সংগ্রহের পরিকল্পনা 
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিএসএল পুঁজিবাজার থেকে ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করবে। করপোরেট সুকুক বা বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে এ অর্থ সংগ্রহ করে সরকারকে পরিশোধ করতে হবে। অগ্রণী ব্যাংকের পাওনা পরিশোধের তারিখ থেকে পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে সুকুক বা বন্ড ইস্যুসহ যাবতীয় কার্যক্রম শেষ করতে হবে।

নির্ধারিত ছয় মাসের মধ্যে সুকুক বা বন্ড ইস্যু করা সম্ভব না হলে সপ্তম মাস থেকে সরকারকে অর্থ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত ৫০০ কোটি টাকার ওপর বার্ষিক ৫ শতাংশ হারে অর্থ দিতে হবে। তবে সুকুক বা বন্ড ইস্যু এবং এর মাধ্যমে সরকারকে অর্থ পরিশোধের কার্যক্রম ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যে শেষ করতে হবে।

সরকার বিএসএলের পক্ষে পরিশোধ করা অবশিষ্ট ৩৮৪ কোটি ৪০ লাখ ৫০ হাজার টাকার বিপরীতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যে সরকারের অনুকূলে সমমূল্যের সাধারণ (অর্ডিনারি) শেয়ার ইস্যু করবে বিএসএল।

করপোরেট সুকুক বা বন্ড, সাধারণ শেয়ার এবং সরকারকে অর্থ পরিশোধ বা সমন্বয়ের পদ্ধতি ও সময়সীমা নির্ধারণের পাশাপাশি সুকুক বা বন্ড ইস্যুতে বিদেশের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অর্থ প্রদানের শর্ত সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।

কয়েক দফা বৈঠক 
অর্থ বিভাগের নথি অনুযায়ী, বিএসএলের ঋণের দায় থেকে উত্তরণের বিষয়ে কয়েক দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসব বৈঠকে অগ্রণী ব্যাংকের ঋণের হিসাব, সুদ এবং বিএসএলের চূড়ান্ত দায় নিয়ে আলোচনা হয়। নথিতে বলা হয়েছে, ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকার সংস্কারের জন্য বিএসএল ২০১৫ থেকে ২০১৮ সময়ে অগ্রণী ব্যাংক থেকে ৫৭৪ কোটি টাকা বাণিজ্যিক ঋণ নেয়। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঋণের বিপরীতে বিএসএল মোট ১৯৩ কোটি ৩৩ লাখ টাকা পরিশোধ করে।

এ বিষয়ে গঠিত কমিটির হিসাবে, অগ্রণী ব্যাংকের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী বিএসএলের কাছে পাওনা ছিল এক হাজার ৫০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। সংশোধিত হিসাবে তা দাঁড়ায় এক হাজার ৭৮ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। তবে পরিচালনা পর্ষদের সম্মতিক্রমে ব্যাংক আগের এক হাজার ৫০ কোটি ৬৭ লাখ টাকার হিসাব বহাল রাখতে পারে বলে সিদ্ধান্ত হয়। পরবর্তী সময়ে অগ্রণী ব্যাংকের বোর্ড সভায় মোট দেনা থেকে ব্লকড হিসাবে থাকা ১২৪ কোটি ৪৭ লাখ ৮৯ হাজার ৪০৯ টাকা সমন্বয় এবং ৪১ কোটি ৮১ লাখ ১৩ হাজার ৬৯২ টাকা সুদ মওকুফের সিদ্ধান্ত হয়। এর পর চূড়ান্ত পরিশোধযোগ্য দেনা ৮৮৪ কোটি ৪০ লাখ ৪৮ হাজার ৫০১ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

source : samakal

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here