Amar Desh
হানা এলশেহাবি

তুরস্ক এবং সৌদি আরব যৌথ উদ্যোগে পঞ্চম প্রজন্মের ‘কান’ (KAAN) যুদ্ধবিমান তৈরির প্রকল্পের মাধ্যমে নিজেদের বিমানবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক বিমান প্রতিরক্ষা শক্তিতে নতুন রূপ দিতে যাচ্ছে। দুই দেশের এই উদ্যোগের লক্ষ্য যুদ্ধবিমান সংগ্রহে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং স্থানীয় প্রতিরক্ষা শিল্পকে শক্তিশালী করা। এই অংশীদারত্ব সৌদি আরবকে তার নিজস্ব মহাকাশ শিল্প গড়ে তুলতেও সক্ষম করবে।
অন্যদিকে, তুরস্ক তার উন্নত প্রযুক্তির জন্য তহবিল সংগ্রহ এবং বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করবে, যা মধ্যপ্রাচ্যের বিমান শক্তির বর্তমান ভারসাম্যে পরিবর্তন আনতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, তাদের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ইসরাইলের বিমানবাহিনীর শক্তি ও সক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ জানানো।
তুরস্কের পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ‘কান’-এর উন্নয়নে সৌদি আরবের আর্থিক সহায়তা প্রদান এবং এই বিমান ক্রয়ে দেশটির আগ্রহের খবরে ওয়াশিংটনে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। সৌদি আরবকে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান সরবরাহ করতে ২০২৫ সালে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের পরও বিকল্প উন্নত বিমান কেনায় রিয়াদের আগ্রহের খবরে মার্কিন কর্মকর্তারা হতাশা প্রকাশ করেছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান অস্থিতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে এই অঞ্চলের দেশগুলো যুদ্ধাস্ত্রের এমন সরবরাহকারী খুঁজছে, যারা প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং অভ্যন্তরীণ উন্নয়নের সুযোগের পাশাপাশি উন্নত সক্ষমতাও দেবে। সংঘাতের ব্যয়ের দায় গ্রহণের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপও এই দেশগুলো বিকল্প অংশীদারত্বের দিকে ঝুঁকে পড়তে উৎসাহিত করছে। এটি শেষ পর্যন্ত আঞ্চলিক অস্ত্রবাজারে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।
মার্কিন কৌশলে মধ্যপ্রাচ্যের অবস্থানের পুনর্মূল্যায়ন
ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বব্যাপী তার সামরিক উপস্থিতি কমানোর কথা বলার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বহীন একটি অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৫ সালের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে আবির্ভূত হওয়ায় এ অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব হ্রাস পেয়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও তাদের অংশীদার এবং সমরাস্ত্র কেনার কৌশলে বৈচিত্র্য আনার দিকে ঝুঁকছে।
এ কারণেই তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো আঞ্চলিক এবং আঞ্চলবহির্ভূত পক্ষগুলোর সঙ্গে সৌদি আরবের সহযোগিতা বেড়েছে। তবে, এই বৈচিত্র্য আনার প্রচেষ্টা ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করার উদ্দেশ্যে নয়, বরং নতুন কৌশলগত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য। আঙ্কারা এবং ইসলামাবাদ উভয়ই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক বজায় রেখেছে এবং এফ-৩৫ কর্মসূচিতে তুরস্কের আবার যুক্ত হওয়ার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে আলোচনা চলছে। একইভাবে, ট্রাম্প দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে পাকিস্তান-মার্কিন সম্পর্কও বেড়েছে। তবে, ইরান যুদ্ধের আঞ্চলিক প্রভাব সামলাতে যুক্তরাষ্ট্রের অক্ষমতা এই অঞ্চলের দেশগুলোকে নিরাপত্তার জন্য এবং অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রের জন্য অন্যত্র সন্ধানে বাধ্য করতে পারে।
আঙ্কারার সোশ্যাল সায়েন্সেস ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট ফর এরিয়া স্টাডিজের সহকারী অধ্যাপক বারিন কায়াওগলু সংবাদমাধ্যম ‘দ্য নিউ আরব’কে বলেছেন, ‘ইরানে ইসরাইল-মার্কিন আগ্রাসনের সময় ট্রাম্প প্রশাসন ইসরাইলকে রক্ষা করাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল, যা উপসাগরীয় দেশগুলোর কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গিকে বদলে দেবে।’
ওয়াশিংটনের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি অংশীদারত্ব সম্প্রসারণের জন্য সৌদি আরবের কৌশল সতর্কতার সঙ্গে সাজানো হয়েছে। সৌদি-পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চুক্তি এই পদ্ধতিরই একটি উদাহরণ। তবে, বৈচিত্র্য আনার প্রচেষ্টাগুলো মার্কিন স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে সেগুলো বাধারও সম্মুখীন হচ্ছে। চীন-পাকিস্তানের যৌথ উদ্যোগে তৈরি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান কেনার ক্ষেত্রে সৌদির আগ্রহ যুক্তরাষ্ট্রের বাধার মুখে পড়েছিল, যা উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিরক্ষায় চীনাব্যবস্থার অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে ওয়াশিংটনের বিরোধিতারই প্রমাণ। তাই, উন্নত সমরাস্ত্র কেনার ব্যাপারে ওয়াশিংটনের বেঁধে দেওয়া সীমার বাইরে যাওয়ার সক্ষমতা রিয়াদের কতটুকু আছে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, যতক্ষণ পর্যন্ত সৌদি আরব এফ-৩৫ ক্রয়ে আগ্রহী থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ‘কান প্রকল্পে’ রিয়াদের অংশগ্রহণে ওয়াশিংটন বাধা নাও দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশক ধরেই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর পছন্দের নিরাপত্তা অংশীদার। তবে, মার্কিন নেতৃত্বাধীন যুদ্ধের ব্যয়ের ভার আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা সংকট সৃষ্টি করছে, যা এই অঞ্চলের দেশগুলোর সমরাস্ত্র ক্রয়সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে ওয়াশিংটনের প্রভাব কমিয়ে দিতে পারে।
ওয়াশিংটন বর্তমানে একটি জটিল কৌশলগত উভয়সংকটে পড়েছে। একদিকে, মার্কিন নিরাপত্তাবলয় উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোর একটি নির্ধারক হিসেবে কাজ করছে। অন্যদিকে, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদানকারী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহও বাড়ছে এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে।
আঙ্কারার পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান ‘কান’ নিয়ে রিয়াদের আগ্রহের কারণও এটাই। ওয়াশিংটন ২০২৫ সালে সৌদি আরবের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির বিষয়ে প্রাথমিকভাবে সম্মত হয়েছিল; কিন্তু ইসরাইলের বিরোধিতাসহ কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে এই চুক্তিটি জটিলতার মধ্যে পড়েছে। এর মধ্যে বড় সমস্যা হলো ইসরাইলের ‘কোয়ালিটেটিভ মিলিটারি এজ’ (কিউএমই) বা আকাশ শক্তিতে ইসরাইলের প্রাধান্য বজায় রাখার সঙ্গে সম্পর্কিত উদ্বেগ। এটি যুক্তরাষ্ট্রের এমন একটি অঙ্গীকার, যা অনুযায়ী যেকোনো উন্নত মার্কিন প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হস্তান্তরের ক্ষেত্রে এই অঞ্চলে ইসরাইলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব অবশ্যই বজায় রাখতে হবে।
সুতরাং, সৌদির কাছে এফ-৩৫ বিক্রির ক্ষেত্রে এমন বিমান অন্তর্ভুক্ত থাকার সম্ভাবনা আছে, যেগুলোর সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে সীমিত এবং ভবিষ্যতে পরিবর্তনের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ থাকবে। এই বিধিনিষেধগুলো ক্রেতার পরিচালনগত স্বায়ত্তশাসনকে সীমাবদ্ধ করবে। এই সীমাবদ্ধতার কারণে রিয়াদ এমন অংশীদার খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে, যারা কম বিধিনিষেধের বিনিময়ে উন্নত সমরাস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ দেবে।
অবশ্য, তুরস্কের যুদ্ধবিমান কর্মসূচি ভালোভাবে এগোলেও এখনো আমেরিকার সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছায়নি। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষায় আমেরিকার সমকক্ষ থেকে তুরস্কের সম্ভবত আরো পাঁচ-দশ বছর লাগবে। ‘কান’-এর প্রতি আগ্রহ দেখানোর আগেও সৌদি আরব গ্লোবাল কমব্যাট এয়ার প্রোগ্রামে (জিক্যাপ) যোগ দেওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখেছিল, যা যুক্তরাজ্য, ইতালি এবং জাপানের নেতৃত্বে পরিচালিত ষষ্ঠ প্রজন্মের একটি যুদ্ধবিমান তৈরির উদ্যোগ।
প্রাথমিক চুক্তি সত্ত্বেও এফ-৩৫ বিক্রিতে বিলম্ব বা বাধা সৃষ্টি করতে পারেÑএমন জটিলতা সম্পর্কে সচেতন রয়েছে রিয়াদ। ২০২১ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতও চুক্তি করেছিল, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র প্রাথমিকভাবে এফ-৩৫ বিক্রির অনুমোদন দিয়েছিল। কিন্তু আমিরাতের নেটওয়ার্কে চীনা প্রযুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ এবং পরে চুক্তির প্রক্রিয়া নিয়ে আমিরাতের হতাশার কারণে চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত স্বাক্ষরিত হয়নি।
কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আলী বাকির মনে করেন, ইরান যুদ্ধ এই অঞ্চলের দেশগুলো তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে জোর দিতে উৎসাহিত করবে। একই সঙ্গে সৌদি আরব, তুরস্ক, পাকিস্তান ও সম্ভবত মিসরকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করার আলোচনার গুরুত্বকে বাড়িয়ে দেবে।
যুদ্ধে উন্নত পশ্চিমা বিশ্বের বাইরের দেশের সামরিক ব্যবস্থাগুলোর ক্রমবর্ধমান মোতায়েন এবং এগুলোর কার্যকারিতা এই প্রবণতাকে আরো শক্তিশালী করছে। ২০২৫ সালের মে মাসে ভারতের সঙ্গে কয়েক দিনের যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের চীনের তৈরি জে-১০সি যুদ্ধবিমান ব্যবহার এবং ইরানের হামলা প্রতিহত করতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দক্ষিণ কোরিয়ার চেওংগুং-২ ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ব্যবহার এর বড় উদাহরণ।
মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসনের পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের। বিশেষ করে, উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোয় থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ইরানের এই হামলা ঠেকাতে পারেনি, যা এসব দেশকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রই ছিল তাদের নিরাপত্তার দীর্ঘদিনের ভরসা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের প্রায় দেড় মাসব্যাপী নির্বিচার হামলা মোকাবিলা করে এই দুই শ্রেষ্ঠ সামরিক শক্তিকে ইরানের পাল্টা আঘাত করার সক্ষমতায় বিস্মিত উপসাগরীয় দেশগুলো। সংগত কারণেই এসব দেশ এখন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আর ভরসা রাখতে পারছে না। একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প উৎস থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার দিকেও ঝুঁকে পড়ছে।
আঞ্চলিক বিমান শক্তির ওপর প্রভাব
তুরস্কের সঙ্গে একটি সফল অংশীদারত্ব সৌদি আরবকে তার বিমানবাহিনীকে আধুনিকীকরণে সক্ষম করতে পারে, যা তার ইউরোফাইটার এবং এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের বহরকে উন্নত এবং স্থানীয়ভাবে সমর্থিত প্রযুক্তি দ্বারা সমৃদ্ধ করবে। এই পরিবর্তন তুরস্ক-সৌদি প্রতিরক্ষা সহযোগিতার একটি বৃহত্তর ধারার অংশ, যা একটি নতুন, স্থানীয় এবং প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব তৈরির মাধ্যমে এই অঞ্চলের কৌশলগত প্রেক্ষাপটকে বদলে দেবে।
দ্য নিউ আরব অবলম্বনে মোতালেব জামালী
Source: https://www.dailyamardesh.com/op-ed/sub-editorial/amdpbcc5cjv2y








