রাজনৈতিক হিসাব, অদৃশ্য বাধা ও জটিল বাস্তবতার টানাপড়েন

logo

বিশেষ সংবাদদাতা
মুদ্রিত সংস্করণ

বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা সঙ্কটাপন্ন হওয়ায় দলটির ভেতরে-বাইরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরার দাবি নতুন জোর পেয়েছে; কিন্তু তিনি নিজেই জানিয়েছেন- দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত তার জন্য ‘একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়’। এ মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে: কোন শক্তি বা কোন বাস্তবতা তাকে দেশে আসতে বাধা দিচ্ছে?

গতকাল শনিবার সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেয়া পোস্টে তারেক রহমান নিজের মায়ের সঙ্কটাপন্ন শারীরিক অবস্থা, চিকিৎসায় রাষ্ট্রীয়- আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং ব্যক্তিগত আবেগের কথা তুলে ধরলেও দেশে ফিরতে না পারার কারণটি ইচ্ছাকৃতভাবেই অস্পষ্ট রেখেছেন।

খালেদা জিয়ার সঙ্কট, রাজনৈতিক সহমর্মিতা ও আন্তর্জাতিক নজর : খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি বাংলাদেশের রাজনীতিকে এক নতুন মানসিক চাপের মধ্যে এনেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতন-পরবর্তী ট্রানজিশন পলিটিক্সের এক বছর পর, নতুন করে বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ করতে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস তার রোগমুক্তির জন্য দোয়া চেয়েছেন, যা ট্রানজিশন সরকারের ‘সমঝোতার রাজনীতি’ ধরে রাখার ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

একাধিক বন্ধুপ্রতিম দেশ খালেদা জিয়ার চিকিৎসাসহ সহযোগিতার ইচ্ছা জানিয়েছে, যা নির্দেশ করছে, আন্তর্জাতিকভাবে এখনো জিয়া পরিবারের প্রতি সক্রিয় সহানুভূতি রয়েছে।

তারেকের বক্তব্যে ইঙ্গিত : রাজনৈতিক-আইনগত জটিলতা এখনো কাটেনি

তারেক রহমান লেখেন- ‘এটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমার একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত নয়’।

এ বাক্যটি স্পষ্টভাবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি কেড়েছে। কারণ-

  • যুক্তরাজ্যে তার আইনি পরিস্থিতি,
  • প্রত্যাবর্তনের পর দেশে সম্ভাব্য বিচারিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া,
  • বিএনপির অভ্যন্তরীণ মতভেদ,
  • আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর অবস্থান- এ সবই তার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।

তারেক রহমান খোলাখুলি না বললেও তার বক্তব্যে এ বার্তা স্পষ্ট দেশে ফেরাটা কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; বরং বহুপক্ষীয় রাজনৈতিক সমীকরণের বিষয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান : ‘কোনো বাধা নেই’- তবুও প্রশ্ন রয়ে যায়

প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছেন- সরকারের পক্ষ থেকে তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে কোনো নিষেধাজ্ঞা বা আপত্তি নেই।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকারের অনুমতি থাকা মানেই রাজনৈতিক পরিবেশ সম্পূর্ণ অনুকূল- এ কথা বলা যায় না। কারণ-

  • ট্রানজিশন বিচার,
  • ভবিষ্যৎ নির্বাচন,
  • দলগুলোর ক্ষমতার পালাবদল-পরবর্তী অবস্থান,
  • বিএনপির পুনর্গঠন-পরিকল্পনা

– এ সবই তারেকের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।

তারেকের আবেগ বনাম রাজনৈতিক বাস্তবতা

তারেক রহমান লিখেছেন- ‘মায়ের স্নেহস্পর্শ পাওয়ার তীব্র আকাক্সক্ষা আমারও রয়েছে’।

কিন্তু তিনি স্পষ্টই বলেছেন, এ সঙ্কটেও তিনি দেশে ফিরতে পারছেন না, যা পরিস্থিতির গভীরতা বোঝায়।

তার মন্তব্যে বোঝা যায়-

  • পরিস্থিতি এখনো ‘প্রত্যাশিত পর্যায়ে’ পৌঁছায়নি
  • রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে
  • দেশে ফেরাটা তাৎক্ষণিক নয়, বরং ‘সমীকরণ অনুকূলে আসার পর’ সম্ভব

সামগ্রিক চিত্র : বিএনপির ভবিষ্যৎ ও জাতীয় রাজনীতির ওপর প্রভাব

খালেদা জিয়ার সঙ্কটের মুহূর্তে তারেক রহমানের দেশে ফেরা দলকে পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত; কিন্তু তার এ দ্বিধা ইঙ্গিত দিচ্ছে –

  • ট্রানজিশনকালীন রাজনীতিতে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি
  • বিএনপির নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে
  • তারেক রহমানের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক কূটনীতি, আইনগত ঝুঁঁকি ও দলীয় কৌশলের ওপর নির্ভর করছে

তারেক রহমানের দেশে ফেরার ঘোষণা বা অনীহা কেবল পরিবারিক আবেগের বিষয় নয়- এটি বাংলাদেশের ট্রানজিশন রাজনীতির জটিল বাস্তবতায় বহুপক্ষীয় শক্তির প্রভাবিত একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

অন্তর্বর্তী সরকার বলছে- বাধা নেই; তারেক বলছেন- সিদ্ধান্ত তার একার নয়।

এ দুই অবস্থানের মাঝের ব্যবধানটিই আজকের রাজনৈতিক প্রশ্ন।

Source: https://dailynayadiganta.com/printed-edition/CUrmlLYeyby7

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here