বিএনপি’র ১০ দফা, যুগপৎ কর্মসূচি ঘোষণা

logo

স্টাফ রিপোর্টার

১১ ডিসেম্বর ২০২২, রবিবার

ছবি: জীবন আহমেদ

উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কাটিয়ে শান্তিপূর্ণভাবেই শেষ হয়েছে বিএনপি’র ঢাকা বিভাগীয় সমাবেশ। রাজধানীর গোলাপবাগ মাঠে অনুষ্ঠিত সমাবেশে বিপুল লোকসমাগম হওয়ায় তা ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের সড়কে। সমাবেশ থেকে ১০ দফা দাবিতে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে দলটি। কর্মসূচির অংশ হিসেবে ১৩ই ডিসেম্বর সারা দেশে পালিত হবে বিক্ষোভ কর্মসূচি। যুগপৎ আন্দোলনের অংশ হিসেবে ২৪শে ডিসেম্বর হবে সারা দেশে গণমিছিল। এই মিছিল কর্মসূচির মধ্যদিয়েই সমমনা দলগুলোকে নিয়ে সরকার বিরোধী  যুগপৎ আন্দোলন শুরু করবে বিএনপি। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কারাবন্দি থাকায় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সমাবেশে ১০ দফা ঘোষণা করে।

সমাবেশে তিনি বলেন, এই ১০ দফা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দফা। এই দাবি জনগণের দাবি, এটা মানুষের দাবি। গতকাল সকাল ১১টায় সমাবেশ শুরু হওয়ার সময় মাঠ ছাড়িয়ে জনসমাগম আশপাশের কয়েক কিলোমিটার সড়কে ছড়িয়ে পড়ে। সন্ধ্যায় ১০ দফা ঘোষণার মধ্যদিয়ে শান্তিপূর্ণ ভাবে শেষ হয় সমাবেশের কার্যক্রম।

সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, গণতন্ত্র হত্যাকারী, দেশের সম্পদ লুণ্ঠনকারী ও কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতন অত্যাসন্ন। সরকারের রক্তচক্ষু দেখে এই দেশের মানুষ আর ভয় পায় না। সরকার পতনে জনগণ রাস্তায় নেমে এসেছে। আন্দোলন গড়ে তুলছে। ইতিমধ্যেই শেখ হাসিনার অবৈধ সরকারের ভেতরে পতন আতঙ্ক শুরু হয়েছে। দেশরক্ষায় সরকারের পতন অনিবার্য। আমাদের সংসদ সদস্যরা পদত্যাগ করেছেন। আগামীতে এই দেশে নির্বাচন হবে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে।

সেই নির্বাচনের মাধ্যমে জনতার সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে। গণসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।  তিনি বলেন, বিএনপি’র ঢাকা বিভাগীয় সমাবেশ নিয়ে ষড়যন্ত্র হয়েছে। সমাবেশকে পণ্ড করার জন্য বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম ও স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসকে গভীর রাতে বাসা থেকে তুলে নিয়ে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে। ৭ই নভেম্বর পল্টনে আমাদের নেতাকর্মীদের উপর পুলিশ, সরকারের বিভিন্ন বাহিনী অতর্কিত হামলা করে রণক্ষেত্র সৃষ্টি করেছে। আমাদের দলের এক জন নেতাকে গুলি করে হত্যা করেছে। অন্যায়ভাবে অফিসে হামলা করেছে। ভাঙচুর করেছে। আমাদের জিনিসপত্র তুলে নিয়ে গেছে। শত শত কর্মী পুলিশের বুলেটে আহত হয়েছে। বিএনপি’র  কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে শীর্ষ নেতাদেরকে গ্রেপ্তার করেছে।  খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, বিএনপিকে সরকার ভয় পায়। এজন্য সমাবেশ করতে দেয় না।

এ সরকার যেহেতু ফ্যাসিস্ট তাই তারা গণতন্ত্র বুঝে না। যারা গণতন্ত্র ও ভোটের অধিকারের কথা বলে, তাদের ভয় পায়। সরকারের পেটোয়াবাহিনী দিয়ে শহরের মোড় মোড়ে আমাদের নেতাকর্মীদের সমাবেশে আসতে বাধা দেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের উদ্দেশ্যে খন্দকার মোশাররফ বলেন, দিনের ভোট রাতে করে আপনারা ক্ষমতায় থাকতে চান। জনগণ এটা বুঝে গেছে। অর্থনীতি ধ্বংস, ব্যাংক লুট করে নিয়েছে আওয়ামী লীগ। তারা কি এই অর্থনীতি মেরামত করতে পারবে? তারা বিচার ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। দেশের নয়টি বিভাগ থেকে তাই সারা দেশের মানুষ বার্তা দিয়েছে, এই ফ্যাসিস্ট ও লুটেরা সরকারকে জনগণ আর ক্ষমতায় দেখতে চায় না। পুলিশ দিয়ে নাটক সাজিয়ে গণগ্রেপ্তার চালিয়ে অবৈধ আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ রক্ষা হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, অবৈধভাবে ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকা এ সরকারকে হটাতে আগামীদিনে যুগপৎ আন্দোলন অংশ নেবে তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। আগামীদিনে সরকার পতনের এ আন্দোলন সফল হবে।

সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করতে ২৪শে ডিসেম্বর গণমিছিলের মধ্যদিয়ে যুগপৎভাবে আন্দোলনের সূচনা হবে। এ আন্দোলনে দেশবাসীকে অংশ নেয়ারও আহ্বান জানান তিনি। এছাড়াও নিহত নেতাকর্মীদের হত্যার বিচার ও গ্রেপ্তারকৃত নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবিতে ১৩ই ডিসেম্বর ঢাকাসহ জেলা সদরে গণবিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হবে বলেও জানান ড. মোশাররফ। সমাবেশে সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বলেন, আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। জিয়াউর রহমান এদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছেন। বিএনপি একটি সাংবিধানিক পার্টি। এটি গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের পার্টি। মানুষকে সুখী রাখতে হলে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার অভাব পূরণ করতে হবে। দেশে একবার দুর্ভিক্ষ হয়েছিল এবং সে সময় অনেক লোক মারা গিয়েছিল। সেজন্য তখন জিয়াউর রহমান ভাবলেন, পানি যদি আমাদের হয়, তাহলে মানুষ খেতে পারবে।

সে সময় উনি নিজে খাল কাটা শুরু করেছেন এবং উনার সময় দেশে কোনো দুর্ভিক্ষ হয়নি। সে সময় মানুষ সুখী ছিল, কোনোরকম অত্যাচারিত হয়নি। আমরা জিয়াউর রহমানের সৈনিক।  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, আপনার সময় শেষ। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করুন, অন্যথায় মানুষ আদায় করে নেবে। আমরা নয়টা খেলায় (বিভাগীয় সমাবেশ) জয়লাভ করেছি। এটি দশম খেলা। আমরা প্রত্যেক খেলায় জয়লাভ করেছি। আমরা বলেছি, আমরা কোনো কাজ রাতে করবো না, দিনে করবো। সরকার ভয়ে নয়াপল্টনে তাণ্ডব চালিয়েছে। গত পাঁচদিনে নয়াপল্টনে মানুষ নেই। পুলিশ বাহিনী আমাদের পার্টি অফিস দখল করে রেখেছে। এই অবৈধ সরকারকে এ সমাবেশ থেকেই বলতে চাই, কোন পথ দিয়ে যাবেন, চলে যান। যদি না যান তাহলে কীভাবে যেতে হয় তা আমরা দেখাব। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতিকে বলব নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি চালু করুন। দেশের গণতন্ত্র চালু করুন। অন্যথায় মানুষ আদায় করে নেবে।

সরকার ভয় পেয়ে আমাদের ওপর নারকীয় তাণ্ডব চালিয়েছে। কিন্তু আমাদের সমাবেশ বন্ধ করতে পারেনি। বরং মানুষ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এখন সরকার পতনের এক দফা আন্দোলন করবো। স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, এই সরকার মিথ্যা মামলা, হামলা, গুম, হুমকি দিয়ে এই দেশের মানুষকে অবরুদ্ধ করতে চায়। ইতিহাসের শিক্ষা প্রমাণ করে, পৃথিবীর কোথায়ও কোনো স্বৈরাচারী সরকার জোর করে ক্ষমতায় থাকতে পারে না। জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস। পুলিশের বুলেট দিয়ে ও বিএনপি অফিস লুটপাট করে মানুষকে দমিয়ে রাখা যাবে না।  তিনি বলেন, এই দেশের মানুষ কোনো স্বৈরাচার সরকার মেনে নেবে না। স্বাধীনতার সময় গণতন্ত্রের জন্য লাখ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছেন। স্বাধীনতার পরবর্তী তিন বছর তারা মানুষকে হত্যা করে একদলীয় বাকশাল সরকার গঠন করেছিল। তারা পুনরায় আবার বাকশাল কায়েম করেছে। বাংলাদেশের মানুষ বাকশালের জন্য দেশ স্বাধীন করেনি।  স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এই ভোট চোর, রিজার্ভ চোর ও দেশের সম্পদ লুণ্ঠনকারী সরকারের পতন হয়ে গেছে। সংবিধান লঙ্ঘন করে এখন পুলিশ দিয়ে দেশ চালাচ্ছেন শেখ হাসিনা।

এখন দেশ চলছে পুলিশের কথায়। আগামী নির্বাচন হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। এ নির্বাচনে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে। আওয়ামী লীগ কথায় কথায় এখন সংবিধানের কথা বলছে। অথচ আওয়ামী লীগ দেশের সংবিধান ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে দুঃশাসনে পরিণত করেছে।  স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, সরকার ভয় পেয়ে আমাদের ওপর নারকীয় তাণ্ডব চালিয়েছে। কিন্তু আমাদের সমাবেশ বন্ধ করতে পারেনি; বরং মানুষ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এখন সরকার পতনের একদফা আন্দোলন করবো। স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, আমাদের সমাবেশ নিয়ে সব জায়গায় বাধা দেয়া হয়েছে। এক দিনের সমাবেশ মানুষ চার দিন থেকেছে। মানুষ এসেছে সরকারের দুঃশাসন থেকে মুক্তি পেতে।  আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক খেলা খেলতে চায়। খেলা খেলেছে ৭ তারিখ বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর গুলি চালিয়েছে। ১০টা মিটিং করেছি ওয়ার্মআপ করতে। আজকের পর থেকে শুরু হবে রাজপথের লড়াই।

ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি’র আহ্বায়ক আমান উল্লাহ আমানের সভাপতিত্বে গণসমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, কেন্দ্রীয় নেতা আব্দুল্লাহ আল নোমান, বরকত উল্লাহ বুলু, ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, আহমেদ আযম খান, ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, জয়নাল আবেদীন, এডভোকেট আবদুস সালাম আজাদ, ড. আসাদুজ্জামান রিপন, নাসির উদ্দিন আহমেদ অসীম, সালাউদ্দিন আহমেদ, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, মীর সরাফত আলী সপু, শিরিন সুলতানা, বেনজীর আহমেদ টিটো, কাজী আবুল বাশার, নজরুল ইসলাম আজাদ, মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ, হুমায়ুন কবির খান, ডা. দেওয়ান মো. সালাহউদ্দিন, ডা. রফিকুল ইসলাম, প্রকৌশলী আশরাফ উদ্দিন বকুল, সাঈদ সোহরাব, আব্দুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল, কাজী সাইয়্যেদুল আলম বাবুল, তমিজ উদ্দিন মাস্টার, মজিবুর রহমান, হাবিবুর রশিদ হাবিব, আ ক ম মোজাম্মেল হক, ওমর ফারুক সাফিন, শামসুজ্জামান সুরুজ, মুক্তিযোদ্ধা দলের সাদেক আহমেদ খান, মহিলা দলের আফরোজা আব্বাস, স্বেচ্ছাসেবক দলের এসএম জিলানী, কৃষক দলের হাসান জাফির তুহিন, যুবদলের মামুন হাসান, আবদুল মোনায়েম মুন্না, শ্রমিক দলের আনোয়ার হোসাইন, তাঁতী দলের কাজী মনিরুজ্জামান মনির, জাসাসের জাকির হোসেন রোকন, মৎস্যজীবী দলের মো. আব্দুর রহিম, ওলামা দলের আবুল হোসেন, ছাত্রদলের কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ প্রমুখ। আরও উপস্থিত ছিলেন মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, মীর মোহাম্মদ নাসির, আবুল খায়ের ভূঁইয়া, আফরোজা খানম রিতা, জয়নুল আবদীন ফারুক, জহিরুল হক শাহাজাদা মিয়া, ডক্টর এনামুল হক চৌধুরী, ডা. আবদুল কুদ্দুস, মিজানুর রহমান মিনু, ভিপি জয়নাল, মজিবুর রহমান সরোয়ার, হাবিব উন নবী খান সোহেল, মাসুদ আহমেদ তালুকদার, অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম, শামা ওবায়েদ, আজিজুল বারী হেলাল, মাহবুবুর রহমান শামীম, নিলোফার চৌধুরী মনি প্রমুখ।

১০ দফা ঘোষণা: দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের পদত্যাগ চেয়ে ১০ দফা ঘোষণা করেছে বিএনপি। গতকাল রাজধানীর গোলাপবাগ মাঠে বিএনপি’র ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশ থেকে ১০ দফা ঘোষণা করেছেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন। বিএনপি’র মিত্র রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট সব গোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনা করে এ ১০ দফা ঠিক করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

দফাগুলো হলো-

১. বর্তমান জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত করে ক্ষমতাসীন সরকারের পদত্যাগ।

২. ১৯৯৬ সালে সংবিধানে সংযোজিত ধারা ৫৮-খ, গ ও ঘ-এর আলোকে একটি দল নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকার বা অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন।

৩. নির্বাচনকালীন দল নিরপেক্ষ সরকার বা অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, বর্তমান নির্বাচন কমিশন বাতিল করে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন। সেই নির্বাচন কমিশন অবাধ নির্বাচনের অনিবার্য পূর্বশর্ত হিসেবে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করতে আরপিও সংশোধন, ইভিএম পদ্ধতি বাতিল ও পেপার ব্যালটের মাধ্যমে ভোটের ব্যবস্থা এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার বাতিল।

৪. খালেদা জিয়াসহ বিরোধীদলীয় সব নেতাকর্মী, সাংবাদিক এবং আলেমদের সাজা বাতিল। সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও রাজনৈতিক কারাবন্দিদের অনতিবিলম্বে মুক্তি। দেশে সভা, সমাবেশ ও মতপ্রকাশে কোনো বাধা সৃষ্টি না করা। সব দলকে স্বাধীনভাবে গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনে প্রশাসন ও সরকারি দলের কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ বা বাধা সৃষ্টি না করা। স্বৈরাচারী কায়দায় বিরোধী কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করার লক্ষ্যে নতুন কোনো মামলা ও বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার না করা।

৫. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ এবং বিশেষ ক্ষমতা আইন-১৯৭৪সহ মৌলিক মানবাধিকার হরণকারী আইন বাতিল করা।

৬. বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গ্যাস ও পানিসহ জনসেবা খাতের মূল্যবৃদ্ধির গণবিরোধী সিদ্ধান্ত বাতিল।

৭. নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারকে সিন্ডিকেটমুক্ত করা।

৮. ১৫ বছর ধরে বিদেশে অর্থ পাচার, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত, বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত ও শেয়ারবাজারসহ রাষ্ট্রীয় সব ক্ষেত্রে সংঘটিত দুর্নীতি চিহ্নিত করতে একটি কমিশন গঠন। দুর্নীতি চিহ্নিত করে দ্রুত যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ।

৯. গত ১৫ বছরে গুমের শিকার সব নাগরিককে উদ্ধার এবং বিচারবহির্ভূত হত্যা ও রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনার দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা করে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, উপাসনালয় ভাঙচুর এবং সম্পত্তি দখলের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ।

১০. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে সরকারি হস্তক্ষেপ পরিহার করে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ করে দেয়া।

যেমন ছিল গোলাপবাগ সমাবেশ ভোর সাড়ে ৬টা। সূর্য ওঠেনি। চারপাশ অন্ধকার। সুনসান ঢাকা। বাতাসে ভেসে আসছে ‘গণতন্ত্রের মুক্তি চাই’ স্লোগান। রাজধানীর গোলাপবাগ থেকে এই স্লোগান। পূবের আলো পড়ার আগেই সুনসান ঢাকায় উজ্জীবিত বিএনপি নেতাকর্মীরা। গোলাপবাগ মাঠজুড়েই তাদের বিচরণ। মাঠ ছাপিয়ে বাহিরেও অবস্থান নিয়েছেন অনেকে। গোলাপবাগের সড়ক ও ফুটপাথে পাটি, পত্রিকা, কাগজ বিছিয়েও অনেকে বসেছিলেন। বিএনপি’র সমাবেশ ঘিরে ঢাকা ও ঢাকার বিভিন্ন জেলা থেকে আগত এসব মানুষ অবস্থান নিয়েছেন গোলাপবাগে। শুক্রবার সমাবেশের স্থান গোলাপবাগ হবে; এমন ঘোষণার পরই মাঠে আসতে থাকেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। শীত উপেক্ষা করে রাতে হাজার হাজার মানুষ ঘুমিয়ে ছিলেন মাঠের মধ্যে। অনেকে রাতভর স্লোগান দিয়েছেন। ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়।

ধীরে ধীরে মাঠ ভরে সড়কেও অবস্থান নেন নেতাকর্মীরা। সকাল সাড়ে ৭টার মধ্যেই মানিকনগর থেকে সায়েদাবাদগামী সড়কটি নেতাকর্মীদের দখলে চলে যায়। বন্ধ হয়ে যায় একপাশের যান চলাচল। যারা মাঠে ও সড়কে পাটি বিছিয়ে অবস্থান নিয়েছিলেন তারা বসে বসে বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছিলেন। সকালে কোরআন তেলওয়াত ও গানও শোনা গেছে মাইকে। স্লোগান আর গানের সুরে উজ্জীবিত থেকেছেন সবাই। অনেকে রুটি-কলা দিয়ে সকালের নাস্তা সেরেছেন। তাদের মধ্যে একজন রাজশাহী মহানগর বিএনপি’র সাবেক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক একরাম আলী। ভোর ৭টায় তারা একসঙ্গে ৭-৮ জন পাটি বিছিয়ে সড়কে বসে আছেন। সবাই মতিহার থানার বাসিন্দা। রাজশাহী থেকে ভোর ৬টার ট্রেনে এসেছেন তারা। একরাম বলেন, ভোর বেলায় সমাবেশে চলে এসেছি। স্বৈরাচার সরকারের হাত থেকে দেশ ও দেশের মানুষকে মুক্ত করার জন্য এসেছি। এদেশের গণতন্ত্র ফেরানোর জন্য এসেছি। শুক্রবার রাত সাড়ে ৩টায় ঢাকার পাশের জেলা থেকে সমাবেশে এসেছেন আলমগীর সরকার। তিনি বলেন, আসার পথে পুলিশ বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। বিভিন্ন অজুহাত দিয়ে এসেছি।

যেকোনো মূল্যে সমাবেশ সফল করতে চাই আমরা। রাত সাড়ে ৯টায় উত্তর খান থেকে এসেছেন মহিউদ্দিন। রাতে মাঠেই ঘুমিয়ে ছিলেন। তিনি বলেন, গাড়ি বন্ধ এজন্য রাতেই চলে এসেছি। এমনিতেই বাড়িতে থাকতে পারি না পুলিশের ভয়ে। তাই রাতেই চলে এসেছি। শুক্রবার রাত ৮টায় গুলশান থেকে সমাবেশের উদ্দেশ্যে গোলাপবাগ এসেছেন রাজন। রাতে মাঠেই নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন। তিনি বলেন, পুলিশ চেক দিচ্ছে। আজ আরও কড়াকড়ি হবে তাই কাল রাতেই চলে এসেছি। জিয়ার সৈনিকদের ঘুমাতে হয় না। সারারাত মিছিল দিয়েছি। তাদের মতো অসংখ্য মানুষ এভাবে বসেছিলেন মাঠ ও মাঠের বাইরের আশেপাশের সড়কগুলোতে।  মাঠের পশ্চিম পাশে অতিথিদের জন্য স্টেজ বানানো হয়। মাঠে বড় গ্যাস বেলুনে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিভিন্ন পোস্টার ও স্লোগান লিখে তা ওড়ানো ছিল। পুরো গোলাপবাগ, সায়েদাবাদ, মানিকনগরজুড়েই কেবল বিএনপি নেতাকর্মীদের ব্যানার ছিল।

পশ্চিম আকাশে ভোরের আলো দেখা দেয়ার আগে থেকেই একের পর এক মিছিল নিয়ে সমাবেশে এসেছেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মিছিলের সংখ্যা বেড়েছে। বিভিন্ন জেলা থেকে এসেছেন তারা। স্লোগান দিয়ে মাঠে প্রবেশ করেছেন। মাঠে জায়গা না হওয়ায় বাহিরেও অবস্থান করেছেন। চট্টগ্রাম থেকে সমাবেশে আসা সাতকানিয়া উপজেলার যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক লোকমান হাকিম জানান, রাত ১১টায় চট্টগ্রাম থেকে একটি ট্রেন ঢাকায় এসেছে। ট্রেনের সবাই সমাবেশের উদ্দেশ্যে ঢাকা এসেছেন। কমলাপুর থেকে সবাই একসঙ্গে মিছিল নিয়ে সমাবেশের মাঠে এসেছিলেন।