চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) বিভিন্ন দেশের ঋণ প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড় নিয়ে গতকালই হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। এতে দেখা যায়, এ ছয় মাসের মধ্যে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি এসেছে মূলত বহুপক্ষীয় বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে। দ্বিপক্ষীয় সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে শুধু জাপান। এ ছয় মাসে বাংলাদেশকে নতুন করে ২০২ কোটি ডলার ঋণ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান। পাশাপাশি আগে প্রতিশ্রুত ঋণের ৮১ কোটি ২২ লাখ ডলারও এ সময় ছাড় করেছে দেশটি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বিদ্যমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি দেয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা রক্ষণশীল অবস্থান নিয়েছে দ্বিপক্ষীয় ঋণদাতা দেশগুলো। ব্যতিক্রম শুধু জাপান। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশকে ঋণ ও অনুদান হিসেবে বিপুল পরিমাণ সহায়তা দিয়ে এসেছে জাপান। সে ধারা বজায় রেখে বর্তমান পরিস্থিতিতেও নতুন ঋণের গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশের ওপর ভরসা ধরে রেখেছে দেশটি।
দেশটি অন্যান্য দেশকে সহায়তা করে থাকে আনুষ্ঠানিক উন্নয়ন সহযোগিতা (ওডিএ) কর্মসূচির আওতায়। বর্তমানে বাংলাদেশই জাপানি ওডিএর সবচেয়ে বড় গন্তব্য বলে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সিসহ (জাইকা) বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ইআরডির তথ্যেও দেখা গেছে, স্বাধীনতার পর থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত দ্বিপক্ষীয় সহযোগীদের মধ্যে বাংলাদেশের অনুকূলে ঋণ প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড়ের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে জাপান। এ সময়ে দেশটি থেকে ঋণের প্রতিশ্রুতি এসেছে ৩ হাজার ৩৪ কোটি ডলারের বেশি। এর মধ্যে অর্থছাড় হয়েছে ২ হাজার ৪৫ কোটি ১৮ লাখ ডলার। গত ৫২ বছরে বাংলাদেশের অনুকূলে অর্থছাড়ের দিক থেকে দ্বিপক্ষীয় সহযোগীদের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে চীন। যদিও এ সময় দেশটি অর্থ ছাড় করেছে জাপানের তুলনায় অর্ধেকেরও কম বা ৮১১ কোটি ৫০ লাখ ডলার। বর্তমানে জাপানের সঙ্গে চুক্তির অপেক্ষায় পাইপলাইনে রয়েছে জাপানের আরো ৭৫৬ কোটি ৯৫ লাখ ডলারের ঋণ সহায়তা। আর দেশে এখন জাপানি অর্থায়নে ৮২টি প্রকল্প চলমান রয়েছে।
দেশের যোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতের মেগা প্রকল্পগুলোয় জাপানের অর্থায়নই সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে কক্সবাজারে মাতারবাড়ীতে নির্মীয়মাণ গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি অর্থায়ন করছে জাইকা। প্রকল্পে অর্থায়নের পাশাপাশি কারিগরি সহায়তাও দিচ্ছে দেশটি।
জাপানি বিনিয়োগে বাস্তবায়ন হচ্ছে রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প। প্রায় ২১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকায় নির্মীয়মাণ প্রকল্পটিতে জাইকার অর্থায়ন ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি।
জাপানে ছয় বছর বাংলাদেশের কমার্শিয়াল কাউন্সিলরের দায়িত্ব পালন করেছেন এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমানে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশের (আইবিএফবি) উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘১৯৭২ সাল থেকে জাপান বাংলাদেশকে বিপুল পরিমাণ অর্থসহায়তা দিয়ে এসেছে। আগে অনুদান বেশি ছিল। দেশটি থেকে পাওয়া ঋণের সুদহার ১ শতাংশের নিচে। শিনজো আবের সময়ে জাপানে পুঁজির উদ্বৃত্ত তৈরি হয়েছিল। তিনি ২০১৫ সালে বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়ে এসেছিলেন, তখন বিগ বির আওতায় বড় অংকের বিনিয়োগের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দিয়ে গিয়েছিলেন। সেই সময়ের পর থেকে বিনিয়োগ আকারে বছরে ৩০০ মিলিয়নের বেশি অর্থ জাপান দিতে শুরু করে। এক পর্যায়ে মাতারবাড়ীসহ বড় প্রকল্পে জাপান সম্পৃক্ত হয়। বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরে বড় বিনিয়োগ করছে ভারত, এ প্রেক্ষাপটে জাপানও এ এলাকায় উপস্থিতি বাড়ানোর তাগিদ অনুভব করে। ফলে মাতারবাড়ীর গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো কাজগুলো তারা নিল বা পেল। এছাড়া কিছু প্রকল্পে পরোক্ষভাবে অর্থায়নের সুযোগও তারা গ্রহণ করল।’
২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেল প্রকল্পে (এমআরটি-৬) জাইকার বিনিয়োগ ১৬ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা। এটির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এর পুরো রুটে এখন মেট্রো চলাচলও শুরু হয়েছে। হেমায়েতপুর-ভাটারা পর্যন্ত নির্মীয়মাণ মেট্রোরেল (এমআরটি-৫) নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৪২ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাইকা দিচ্ছে ২৯ হাজার ১১৭ কোটি টাকা। ছাড়া যমুনা নদীর ওপর ১৬ হাজার ৭৮০ কোটি টাকায় নির্মাণ করা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলসেতুটি। প্রকল্প ব্যয়ের ৭২ দশমিক ৪ শতাংশ বা ১২ হাজার ১৪৯ কোটি টাকা ঋণসহায়তা দিচ্ছে জাইকা। পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলাগুলোয় সেতু অবকাঠামো নির্মাণে চলমান ওয়েস্টার্ন বাংলাদেশ ব্রিজ ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট, আন্তঃসীমান্ত সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নে গৃহীত ক্রস বর্ডার রোড নেটওয়ার্ক ইমপ্রুভমেন্ট প্রকল্পেও অর্থায়ন করছে জাপান।
দেশটির বিনিয়োগ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘জাপান-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে টোকিও প্রধানত নাগরিক পর্যায়ের যোগাযোগের মাধ্যমে জনগণকে কীভাবে আরো লাভবান করা যায়, সে বিষয়ে কাজ করছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় দেখলে, মুক্ত ও অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিক উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর হলে একটি আঞ্চলিক হাবে পরিণত হবে বাংলাদেশ। আর আগামী দিনগুলোয় বাংলাদেশ হবে উদীয়মান অর্থনীতির দেশ। জাপান যদি সহযোগিতা অব্যাহত রাখে তাহলে তা সে সময় দুই দেশের জন্যই উইন উইন সিচুয়েশন তৈরি করবে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেমন আফগানিস্তান, পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকট রয়েছে। তারা সেনাশাসিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে। আমরা বিগত বছরগুলোয় এসবের মুখোমুখি হইনি। এ কারণে বাংলাদেশকে জাপান অনেক স্থিতিশীল মনে করে।’
জাপানি বাণিজ্য উন্নয়ন সংস্থা জাপান এক্সটারনাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) ১৯৭৩ সাল থেকে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ করে আসছে। সংস্থাটির তথ্যমতে, প্রতি বছর বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ছে। বর্তমানে জেট্রোর মাধ্যমে ৩৩৮টি জাপানি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা করছে। এর মধ্যে ৬৮ শতাংশের বেশি কোম্পানি বাংলাদেশে ব্যবসার আরো প্রসার ঘটাতে চায়।
সারা দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কয়েকটি দেশ কাজও শুরু করেছে। বাস্তবায়ন অগ্রগতি বিবেচনায় এর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে জাপানের বিনিয়োগকারীদের জন্য জাপানিজ অর্থনৈতিক অঞ্চল। আগামী বছরেই নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে নির্মাণাধীন অঞ্চলটিতে বেশকিছু শিল্প স্থাপনের কাজও সম্পন্ন হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।
জাপান সরকার জাপানিজ অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের জন্য ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন প্রজেক্টের আওতায় ১৩ কোটি ৫৩ লাখ ১০ হাজার ডলার সহায়তা দিয়েছে। এ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনে সরকার প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এছাড়া জাইকার আরো ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) তথ্য অনুযায়ী, জিটুজি পদ্ধতিতে বাস্তবায়নাধীন জাপানের অর্থনৈতিক অঞ্চলটির ১ হাজার একরে অন্তত ১০০টি জাপানি কোম্পানি বিনিয়োগ করতে পারবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (জেবিসিসিআই) সেক্রেটারি জেনারেল মো. আনোয়ার শহীদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের জন্য জাপানের চেয়ে ভালো কোনো অংশীদার পাওয়া যাবে না। স্বাধীনতার পর থেকেই দেশটি ব্যাপক সহযোগিতা করে আসছে বাংলাদেশকে। ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ডের মতো দেশকেও তারা সহযোগিতা করেছে। ভারত বড় দেশ হলেও ভারতকেও তারা সহযোগিতা করেছে। অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে তারা খুবই ভালো।’
তবে বিপুল বিনিয়োগে নির্মিত জাপানি বিনিয়োগ প্রকল্পগুলো বেশ ব্যয়বহুল বলে বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে। এর বড় একটি উদাহরণ চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক চারলেনে উন্নীতকরণ প্রকল্প। ২৩ দশমিক ৫২ কিলোমিটার মহাসড়কটিকে চারলেনে উন্নীত করার জন্য ১২ হাজার ১৩৬ কোটি টাকার একটি প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছিল সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর। এ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, নকশাসহ আনুষঙ্গিক পরিকল্পনার দায়িত্বে জাইকার বিশেষজ্ঞরা। জাপানের অর্থায়নে প্রকল্পটিতে প্রতি কিলোমিটারে ২৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছিল। প্রস্তাবে ফ্লাইওভার, সেতু নির্মাণ, ভূমি অধিগ্রহণসহ সম্ভাব্য অন্যান্য ব্যয় যুক্ত করে দেখা গেছে প্রতি কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে সার্বিক খরচ পড়ে ৫২৬ কোটি টাকা, যা একই ধরনের চলমান অন্যান্য প্রকল্পের বরাদ্দের চেয়ে প্রায় দুই-তিন গুণ বেশি ছিল। ব্যাপক সমালোচনার মুখে পরে প্রকল্পের ব্যয় কমিয়ে দেয় পরিকল্পনা কমিশন। সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি কমিয়ে প্রকল্পের ব্যয় নামিয়ে আনা হয় ৮ হাজার ৫৫৬ কোটি ১৬ লাখ টাকায়।
জাইকার ঋণে প্রকল্প ভূগর্ভস্থ গ্রিড উপকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো) ও ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি)। এজন্য ২০১৮ সালে ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকার দুটি প্রকল্প নেয়া হয়। এ টাকায় ২০২৩ সালের মধ্যে রাজধানীর গুলশান ও কারওয়ান বাজারে মাটির নিচে দুটি গ্রিড উপকেন্দ্র নির্মাণের কথা ছিল। সে মেয়াদ শেষ হলেও প্রকল্পের ডিজাইন ছাড়া আর কিছুই করতে পারেনি ডেসকো ও ডিপিডিসি। এরই মধ্যে ১৩০ কোটি টাকা ব্যয় হয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত কাজ শুরুর আগে প্রকল্প দুটি আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান এমপি বলেন, ‘জাপানের প্রকল্পে ব্যয় বেশি হয় বলে শুনেছি। তারা হয়তো মানের বিষয়ে ছাড় দেয় না। অন্যরা হয়তো আপস করে। কিন্তু জাপান ২ টাকার কাজ ২ টাকায়ই করে। দেড় টাকা ব্যয় করে না। তারা সমীক্ষাও ভালোভাবে করে। তারা টেকসই উন্নয়ন সহযোগী। তাদের মাধ্যমে এডিবি থেকেও আমরা অর্থায়ন পাচ্ছি।’