বাংলাদেশে মোটরযান শিল্পের অপার সম্ভাবনা

রোববার, নভেম্বর ২৮, ২০২১ ০৫:৫৯ অপরাহ্ন

স্টার অনলাইন গ্রাফিক্স

যদিও বাংলাদেশে সচ্ছল মধ্যবিত্তের সংখ্যা এবং তাদের ক্রয়ক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে, তবুও ভারত ও থাইল্যান্ডের তুলনায় দেশে ব্যক্তিগত গাড়ির চাহিদা এখনও অনেক কম।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান লাইটক্যাসেল পরিচালিত এক সমীক্ষা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোটরযান শিল্পের আকার, বিশেষ করে ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে, এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশ পিছিয়ে আছে। বাংলাদেশে প্রতি ১ হাজার মানুষের বিপরীতে ২ দশমিক ৫টি গাড়ি রয়েছে।

তবে গত কয়েক বছরে গাড়ির বাজারের আকার বেড়েছে এবং বর্তমানে এর মূল্যমান প্রায় ১০০ কোটি ডলার।

তবে এই খাতের বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন ব্যক্তিগত গাড়ির বাজারের আকার ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি নয়।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে মাত্র ২০ হাজার ৯৩টি ব্যক্তিগত গাড়ির নিবন্ধন হয়েছে, যেটি আকারের দিক দিয়ে মোটরযান শিল্পের মাত্র ৫ দশমিক ৩ শতাংশের সমান।

এসব গাড়ির মধ্যে আছে সেডান বা ব্যক্তিগত গাড়ি, স্পোর্টস ইউটিলিটি গাড়ি (এসইউভি) বা জিপ, অথবা মাল্টি পারপাস গাড়ি (এমপিভি) বা মাইক্রোবাস। ব্যক্তিগত গাড়ির মধ্যে ৫৫ শতাংশই সেডান (ব্যক্তিগত গাড়ি নামেও অভিহিত)। ১২ হাজার ৪০৩টি সেডান গাড়ির নিবন্ধন হয় ২০২০ সালে।

এছাড়াও ব্যক্তিগত গাড়ির মধ্যে ছিল জিপ ও মাইক্রোবাস, যথাক্রমে ৪ হাজার ৯১১ ও ২ হাজার ৭৭৯টি।

তবে গত কয়েকবছরে জিপ ও মাইক্রোবাসের চাহিদা বাড়লেও সেডান গাড়ির নিবন্ধন স্তিমিত অবস্থায় আছে।

গত দশকে বাংলাদেশের মোটরযান খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, বিশেষত ২০১৫ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে। ২০১৭ সালে বিআরটিএ সর্বোচ্চ ৩২ হাজার ৯৪২টি ব্যক্তিগত গাড়ির নিবন্ধনের তথ্য প্রকাশ করেছে। তবে এরপর থেকে এই সংখ্যা কমছে এবং ২০১৮ থেকে ২০২০ এর মধ্যে নিবন্ধিত ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা প্রায় ৩৯ শতাংশ কমেছে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের মোটরযান শিল্প এখনও আমদানি নির্ভর।

বর্তমানে স্থানীয়ভাবে প্রগতি জাপানের মিতশুবিশি মোটর্স গাড়ি এবং চট্টগ্রামের পিএইচপি গ্রুপের অঙ্গসংগঠন পিএইচপি মোটর্স মালয়েশিয়ার প্রোটন হোল্ডিংস বেরহাদ নামক প্রতিষ্ঠানের গাড়ি অ্যাসেম্বল করে থাকে।

সম্প্রতি ভারতের বড় মোটরযান নির্মাণ প্রতিষ্ঠান টাটা মোটর্স ও মাহিন্দ্রা অ্যান্ড মাহিন্দ্রা বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একই ধরনের অংশীদারিত্বে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

বর্তমানে প্রতিদিন সারা দেশে ৬০ থেকে ৬৫টি গাড়ি বিক্রি হয়।

বাংলাদেশ রিকন্ডিশনড ভেহিকেলস ইমপোর্টারস অ্যান্ড ডিলারস এসোসিয়েশনের (বারভিডা) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে দৈনিক ২৯টি গাড়ি বিক্রি হতো। অর্থাৎ, গত ৮ বছরে দৈনিক গাড়ি বিক্রির সংখ্যা প্রায় ১১৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

২০১৯ সালে গাড়ি বিক্রি থেকে মোট ৫ হাজার কোটি টাকা আয় হয়েছে। ১ বছর আগেও এই পরিমাণ প্রায় একই ছিল।

এই শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মতে বাংলাদেশের মোটরযান খাত ২০১২ থেকে বছরে গড়ে ৮ শতাংশ করে বেড়েছে।

অটোমোবাইল শিল্প উন্নয়ন নীতিমালা ২০২১ অনুযায়ী, স্থানীয় অটোমোবাইল শিল্পকে গত দুই দশক ধরে একটি সম্ভাবনাময় শিল্প খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এর পেছনে কারণ হিসেবে এর সন্তোষজনক বার্ষিক প্রবৃদ্ধি এবং জাতীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক অবদানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এ বছর সরকার এই খাতের উন্নয়নের জন্য প্রথমবারের মতো এই নীতিমালার ঘোষণা দেয়। এতে আমদানি নির্ভরতা কমানো, বিদ্যুৎচালিত পরিবহনের ব্যবহার বাড়ানো এবং মোটরযান নির্মাণের আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।

এই নীতিমালায় কর রেয়াত ও রপ্তানি প্রণোদনার মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের দেশে মোটরযান নির্মাণ কারখানাও বসাতে উৎসাহিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

চার চাকার মোটরযানের ক্ষেত্রে সুযোগ

মোটরযান বাজারের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ এবং এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের মধ্যবিত্তের সংখ্যা ও তাদের ক্রয়ক্ষমতাও বাড়ছে। বর্তমানে মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তরাই মূলত ব্যক্তিগত গাড়ির ক্রেতা।

নীতিমালা অনুযায়ী, উদ্যোক্তারা কোনো শুল্ক না দিয়েই গাড়ি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় বড় আকারের যন্ত্র ও আনুষঙ্গিক উপকরণ আমদানি করতে পারবেন।

এছাড়াও বাণিজ্যিক যানবাহন উৎপাদনকারীরা যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে ৪ বছর শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবেন।

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে গত মঙ্গলবার প্রকাশিত নীতিমালা অনুযায়ী বিনিয়োগকারীরা স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বাণিজ্যিক যানবাহন বিপণনের জন্য হ্রাসকৃত সুদে ঋণ নিতে পারবেন।

স্থানীয়ভাবে অ্যাসেম্বল করা অথবা সিকেডি (কমপ্লিটলি নকড ডাউন) গাড়ি রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রণোদনা হিসেবে ১৫ শতাংশ নগদ অর্থ দেওয়া হবে।

নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জনসম্পদের দক্ষতা বাড়ার কারণে স্থানীয় মোটরযান শিল্প সর্বসাধারণের কাছে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

নীতিমালায় বলা হয়েছে, ‘ভবিষ্যতে বাংলাদেশের মোটরযান শিল্প বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের অংশে পরিণত হতে পারে।’

এতে আরও বলা হয়, সাধারণ জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ার কারণে গাড়ি ও মোটরসাইকেলের চাহিদা বাড়ছে।

এই নীতিমালার অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে দেশের মোটরযান সংক্রান্ত ইকোসিস্টেমকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করা।

অপরদিকে, এই নীতিমালায় আগে ব্যবহৃত রিকন্ডিশনড গাড়ি আমদানিকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে, কারণ এ ধরনের আমদানি করা গাড়ির চেয়ে স্থানীয়ভাবে অ্যাসেম্বল করা গাড়ি সুলভ।

নীতিমালায় বলা হয়েছে, সরকার একইসঙ্গে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকে আকর্ষিত করবে। কর্তৃপক্ষ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত গাড়ির জন্য বৈশ্বিক মানদণ্ডের সঙ্গে মিল রেখে মানদণ্ড তৈরি করবে এবং স্থানীয় উৎপাদনকারীদের নতুন বাজারে প্রবেশ করতে সাহায্য করবে।

নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, ‘প্রগতিশীল ইজারা নীতি অবলম্বন করে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত মোটরযানের বাজারকে সম্প্রসারণ করা হবে।’

নিটল-নিলয় গ্রুপের চেয়ারম্যান আব্দুল মাতলুব আহমাদ জানান, এই নীতিমালা বাংলাদেশকে একটি মোটরযান নির্মাণকারী দেশে পরিণত করবে।

‘ভোক্তাদের সুবিধা হবে, কারণ তারা সাশ্রয়ী মূল্যে যানবাহন পাবেন’, বলেন তিনি।

এই নীতিমালার মাধ্যমে স্থানীয় উৎপাদনকারীরা ১০ লাখ টাকার মধ্যে ভোক্তার কাছে একটি সেডান গাড়ি বিক্রি করতে পারবেন। ভোক্তাদের আমদানি শুল্ক দিতে হবে না দেখে এই সুবিধা পাওয়া যাবে বলে জানান মাতলুব।

সরকার রিকন্ডিশন্ড গাড়ির ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা একটি নীতিমালা তৈরি করবে। রিকন্ডিশন্ড গাড়ির ব্যবসা যারা পরিচালনা করছেন, তাদেরকে সহায়তা করার জন্য মূলত এটি তৈরি করা হবে।

এছাড়াও, পুরোনো যানবাহন ধ্বংস করে ফেলা বা স্ক্র্যাপিং এর জন্যেও একটি নীতিমালা তৈরি করা হবে। সরকার ডাম্পিং (উৎপাদন মূল্যের চেয়ে কম দামে বিক্রি) ও অন্যান্য অন্যায্য ব্যবসায়িক কৌশল প্রতিরোধ করার জন্য অ্যান্টি-ডাম্পিং কর আরোপ করবে।

সিকেডি কারখানা স্থাপনের জন্য যন্ত্র আমদানির ক্ষেত্রে এককালীন শত ভাগ কর রেয়াত সুবিধা দেওয়া হবে।

সিকেডি লেভেল উৎপাদকদের ক্ষেত্রে যন্ত্রাংশ আমদানিতে কর রেয়াত সুবিধার পরিমাণ ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ হবে। যদি স্থানীয় বাজার থেকে যন্ত্রাংশ জোগাড় করা হয়, তাহলে করের পরিমাণ ১০ শতাংশের বেশি হবে না বলে নীতিমালায় বলা হয়েছে।

কারখানাগুলো ১ শতাংশ কর রেয়াত পাবে যদি তারা তাদের বার্ষিক আয়ের ১ শতাংশ গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে ব্যয় করে।

এই নীতিমালা ব্যক্তিগত গাড়ি, বাস, ট্রাক ও থ্রি হুইলারসহ সব ধরনের পরিবহনকে ২০৩০ সালের মধ্যে বৈদ্যুতিক যানবাহনে (ইভি) রূপান্তরের চেষ্টা চালাবে।

ইভি অ্যাসেম্বল ও উৎপাদনের সঙ্গে সংযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে ১০ বছরের কর অবকাশ সুবিধা দেওয়া হবে।

ইভির উৎপাদন বাড়াতে এবং কার্বন নিঃসরণকে ন্যুনতম পর্যায়ে রাখতে সরকার একটি সুনির্দিষ্ট পরিমাণ সময় পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের আর্থিক প্রণোদনা, সড়ক কর রেয়াত ও হ্রাসকৃত নিবন্ধন ফি সুবিধা দিতে পারে।

বাংলাদেশের মোটরযান খাতের বিভিন্ন সমস্যা

দেশের মোটরযান বাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, ব্যক্তিগত গাড়ির বাজার এখনও প্রারম্ভিক অবস্থায় আছে।

বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের (বেইল) সভাপতি মান্নান খান বলেন, ‘আমাদের দেশের নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা গাড়ি কেনার স্বপ্ন দেখেন, কিন্তু উচ্চ মূল্যের কারণে কিনতে পারেন না।’

এই খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকার ৯০ এর দশকের শুরুর দিকে গাড়ি আমদানির ওপর শুল্ক বসানোর কারণে শুধুমাত্র উচ্চবিত্তরা তাদের নিজেদের ব্যক্তিগত অথবা বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য গাড়ি কিনতে পারতেন।

তবে ৩০ বছরে দেশের অর্থনীতি অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। এখন শহরগুলোতে মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তদের জন্য গাড়ি এখন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উচ্চ করের কারণে বাংলাদেশের গাড়ির দাম অনেক বেশি। এ কারণে ফোর হুইলারের বাজার এখনো ভারত বা থাইল্যান্ডের মতো বাড়তে পারেনি।

আমদানিকারকদের মতে, জাপান থেকে ৫ হাজার মার্কিন ডলার খরচে একটি গাড়ি আমদানি করা হলেও উচ্চ করের কারণে বাংলাদেশে এর খুচরা মূল্য হয় ২২ লাখ টাকার মত।

মধ্যবিত্তরা উচ্চ মূল্যের কারণে নিজ গাড়ির মালিক হতে পারছেন না। স্থানীয় উৎপাদকদের জন্য করের পরিমাণ কমানো না হলে বাজারের আকারও বাড়বে না।

অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ ইশতিয়াক খান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here