গণমাধ্যম স্বাধীন না হলে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন শক্তিশালী হবে না : রিজভী

গণমাধ্যম স্বাধীন না হলে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন শক্তিশালী হবে না : রিজভী

গণতন্ত্রকে বিকশিত ও শক্তিশালী করতে এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।

তিনি বলেন, গণমাধ্যম যদি বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করে, সমাজে সন্ত্রাস কমে যাবে। সমাজে ঘুষ খাওয়া কমে যাবে। সমাজ অনেক পরিচ্ছন্ন হয়ে উঠবে।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির ৩১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

রুহুল কবির রিজভী বলেন, গণতন্ত্রকে বিকশিত করতে হলে এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হলে গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। প্রশাসন ও আদালতকে যেমন : নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে হয়, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণমাধ্যমকেও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে হয়।

তিনি বলেন, গণতন্ত্রকে বিকশিত করতে হলে, আমাদের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে, আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কোনো বিকল্প নাই।

গণমাধ্যমের দায়িত্বের কথা তুলে ধরে বিএনপির এই নেতা বলেন, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার সার্বজনীন রূপ হচ্ছে— গণমাধ্যম সত্য প্রচার করবে। অনেক যাচাই-বাছাইয়ের পর সত্য প্রকাশ করবে। সত্য প্রচার করতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি এলেও সেই ঝুঁকি সাংবাদিকদের গ্রহণ করতে হয়।

তিনি বলেন, অপপ্রচার ও কারও বিরুদ্ধে কলঙ্ক লেপন গণমাধ্যম ও গণতন্ত্রের প্রাণশক্তিকে নিঃশেষ করে দেয়। গণমাধ্যমের মূল দায়িত্ব সত্যনিষ্ঠ ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করা।

বিগত সময়ের গণমাধ্যম পরিস্থিতির সমালোচনা করে রিজভী বলেন, গত ১৭ বছরে দেশে অনেক টেলিভিশন ও পত্রিকা থাকলেও মতপ্রকাশের সুযোগ ছিল সীমিত। তার ভাষায় পরিস্থিতি ছিল, ‘কথা বলা হবে, মত প্রকাশ হবে শুধু মাত্র একজন ব্যক্তির, একটি রাজনৈতিক দলের।’

তিনি বলেন, যারা এর বাইরে মত প্রকাশের চেষ্টা করেছেন, তারা ভয়ভীতির শিকার হয়েছেন অথবা কারাগারে থাকতে হয়েছে। টকশো, টকশোর উপস্থাপক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও বিভিন্নভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

রিজভী আরও বলেন, মাঠপর্যায়ের অনেক সাংবাদিক প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও গণতন্ত্রের আলো জ্বালিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন। তাদের কারণেই গণতন্ত্রের পরিসর পুরোপুরি সংকুচিত হয়ে যায়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিগত সময়ের গণমাধ্যমের ভূমিকা তুলে ধরতে গিয়ে একটি টেলিভিশন টকশোর উদাহরণ দেন বিএনপির এই নেতা। তিনি বলেন, একজন কৃষিবিজ্ঞানী গবেষণায় একটি বড় আকারের বেগুনে ক্যানসারের কিছু উপাদান থাকার তথ্য পেয়েছিলেন। ওই গবেষণা নিয়ে কথা বলতে তাকে টেলিভিশনের একটি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেখানে তার গবেষণাকে সরকারবিরোধী কোনো অ্যাজেন্ডা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছিল বলে দাবি করেন রিজভী।

তিনি বলেন, ‘একজন নিরেট কৃষিবিজ্ঞানী। সে হতভম্ব হয়ে গেছে। দেখুন, এটা আমার গবেষণার ফাইন্ডিংস। মানুষকে সতর্ক করা আমার দায়িত্ব।’

রিজভীর অভিযোগ, হত্যা, খুন ও গুমের মতো ঘটনাগুলো ঘটলেও অনেক ক্ষেত্রে সেসবের সংবাদ প্রকাশ করা হয়নি, বরং সরকারের বয়ান তৈরি করে তা প্রচার করা হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রচলিত সংবাদমাধ্যমে চিফ রিপোর্টার, নিউজ এডিটর ও এডিটর থাকেন। একটি সংবাদ যাচাই-বাছাই ও সম্পাদনার পর প্রকাশ করা হয়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন সম্পাদকীয় কাঠামো নেই। ফলে সেখানে সত্য-মিথ্যা যাচাই না করেই নানা তথ্য ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এক্ষেত্রে সাংবাদিকদেরই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি। বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুৎসা, অপপ্রচার ও ব্যক্তিগত বিষয়কে সংবাদ হিসেবে উপস্থাপন করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

রিজভী বলেন, ‘কে দ্বিতীয় বিয়ে করেছে, কার ছেলে কার মেয়ের সঙ্গে প্রেম করছে— এটা তো সংবাদপত্রের নিউজ হতে পারে না।’

সংবাদ কী–তা বোঝাতে তিনি ব্যতিক্রমের উদাহরণ দেন। বলেন, ‘সাপ ব্যাঙকে ধরা– এটা আমরা সবাই জানি, এটা সংবাদ নয়। কিন্তু যেদিন ব্যাঙ সাপকে ধরে, সেটা হচ্ছে সংবাদ।’

সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে ঝুঁকির কথাও তুলে ধরেন বিএনপির এই নেতা। তিনি বলেন, সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক সাংবাদিক আহত হয়েছেন, কেউ পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, আবার কেউ পৃথিবী থেকে চলে গেছেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা এই পেশাকে আরও মহিমান্বিত করতে হবে।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সঙ্গে নিজের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে রিজভী বলেন, সংগঠনটির সাংবাদিকরা বিভিন্ন সময়ে তাদের দলের জন্য একটি আশ্রয়ের জায়গা হিসেবে কাজ করেছেন। বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রতিকূলতার সময়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেন তিনি।

তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদী আক্রমণের মধ্যে স্পেসগুলো, পরিসরগুলো এত সংকুচিত হচ্ছিল যে যারা সেই সময় বিরোধী মত প্রকাশ করেন, তাদের কোনো জায়গা ছিল না। কোথায় দাঁড়াবে, কোথায় কী বলবে– সে জায়গা ছিল না। সেটা কিছুটা ছিল এই ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির ৩১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে সাংবাদিকদের শুভেচ্ছা জানিয়ে রিজভী বলেন, গণতন্ত্রের পথচলাকে একটি কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের দিকে এগিয়ে নিতে গণমাধ্যমকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হবে।

তিনি বলেন, আমাদের গণতন্ত্রকে বিকশিত করতে হলে, আমাদের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে, আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কোনো বিকল্প নাই।’

অনুষ্ঠানে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকনের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেলের সঞ্চালনায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় মিডিয়া ও প্রচার বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি এবং পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ।

Source: https://www.dhakapost.com/politics/481829

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here