
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক একান্ত সহকারী সচিব (এপিএস) গাজী হাফিজুর রহমান লিকুর নামে শতকোটি টাকার সম্পদ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ঢাকায় বেশ কয়েকটি ফ্ল্যাট, নিজ জেলা গোপালগঞ্জে বেনামে ১০ তলা মার্কেটসহ বেশ কয়েকটি ভবন, কুয়াকাটায় রিসোর্ট, ৪০০ বিঘা জমিতে মৎস্য ঘের, পৈতৃক জমিতে ৫ তলা ভবন, শ্যালকের নামে (বেনামে) ৬ তলা বাড়িসহ বহু স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রয়েছে লিকুর।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) গোয়েন্দা শাখার গোপন অনুসন্ধানে নামে-বেনামে ওইসব সম্পদের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। গতকাল বুধবার কমিশন তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতির মাধ্যমে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে চূড়ান্ত অনুসন্ধান শেষে তাঁর স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। পুরো অনুসন্ধান শেষে লিকু ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
দুদকের অনুসন্ধান টিম সূত্রে জানা গেছে, লিকু ২০০৯ সালের এপ্রিল থেকে প্রধানমন্ত্রীর অ্যাসাইনমেন্ট অফিসার হিসেবে কাজ শুরু করেন। পরে তিনি ২০১৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব-২ পদে নিয়োগ পান। সম্প্রতি অনিয়ম-দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগে তাঁকে ওই পদ থেকে বাদ দেওয়া হয়। এর পর তিনি ওমরাহ করতে গিয়ে আর দেশে ফেরেননি। তাঁর বাড়ি গোপালগঞ্জ সদরে। দুদকের অনুসন্ধানে লিকু, তাঁর স্ত্রী, শ্যালকসহ অন্যদের নামে সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। ওইসব সম্পদের বৈধ উৎস খুঁজে পাওয়া যায়নি।
খুলনা-ঢাকা-সাতক্ষীরা-গোপালগঞ্জ রুটে ‘ওয়েলকাম এক্সপ্রেস’ নামে ৪২টি যাত্রীবাহী লাক্সারি বাসে টুঙ্গিপাড়ার মো. কালুর মালিকানা রয়েছে। ঢাকা মহানগরে ‘ওয়েলকাম বাস সার্ভিসেও’ তাঁর শেয়ার রয়েছে। তবে এর মালিকানা মূলত লিকুর। গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ার কুশলা ইউনিয়নের গোড়ার গ্রামসহ গোপালগঞ্জ সদর থানাধীন কাজুলিয়া গ্রামের ৪০০ বিঘা জমিতে মৎস্য ঘের রয়েছে লিকুর নামে।
গোপালগঞ্জের থানাপাড়া রোডে পৈতৃক জমিতে লিকুর টাকায় ৫ তলা ভবন রয়েছে, যার মূল্য ২ কোটি টাকা। তার পাশেই লিকু তাঁর শ্যালক শেখ মো. ইকরাম ওরফে হালিম মোল্লার নামে ৬ তলা ভবন তৈরি করেছেন।
ঢাকার মোহাম্মদপুরের বছিলায় ‘মধু সিটি’তে এক বিঘা জমির ওপর ৬ তলা ভবন নির্মাণ করেছেন লিকু। ঢাকার আদাবরের ৬ নম্বর রোডের ৫৮৩ নম্বর বাড়ির এ-৬ ফ্ল্যাটটি তাঁর স্ত্রী রহিমা আকতারের নামে। ধানমন্ডির ২৫ মিতালি রোড়ে তাঁর বেনামে আরও একটি ফ্ল্যাট রয়েছে।
গোপালগঞ্জ পৌরসভার ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে সোনাকুড় নামক স্থানে ১৩ শতাংশ জমিতে শ্যালক ইকরাম মোল্লা ও তাঁর স্ত্রী স্বর্ণা খানমের নামে কমার্শিয়াল ও আবাসিক ১০ তলা স্বর্ণা টাওয়ার নির্মাণ করেছেন লিকু। ভবনটিতে আধুনিক সুইমিংপুলসহ ৪০টি ফ্ল্যাট রয়েছে। সমুদ্রসৈকত এলাকা কুয়াকাটার লাইট হাউজের পাশে ওশান ব্লু রিসোর্ট রয়েছে লিকুর মালিকানাধীন।
দুদকের গোপন তথ্যানুসন্ধানে লিকুর বেনামে কয়েকটি বাড়ির তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে গোপালগঞ্জ শহরের উত্তর গোবরা নামক স্থানে আলিশান ডুপ্লেক্স বাড়ি, একই স্থানে তিন তলা আরও একটি বাড়ি, সোনাকুড় নামক স্থানে নিলের মাঠের পাশে ১০ শতাংশ জমিতে একতলা বাড়ি, তাঁর ছোট ভাই গাজী শফিকুর রহমান ছোটনের নামে বকুলতলায় খ্রিষ্টানদের কবরস্থানের পাশে ৭ কাঠা জমি, গোপালগঞ্জ পৌরসভার ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার হুমায়ুনের কাছ থেকে ১৫ বিঘা জমি কিনেছেন। লিকু ২০০৯-১০ করবর্ষে প্রথম আয়কর প্রদান করেন। ওই সময়ে তাঁর বেতন ভাতা হতে আয় ৩০,৩৫২ টাকা। তখন তাঁর মোট সম্পদ ছিল ৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ করবর্ষে তাঁর মূল বেতন ৬৭ হাজার টাকা।
উপাচার্য সৌমিত্র শেখরের অঢেল সম্পদ
দুদকের প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, ময়মনসিংহের ত্রিশালের কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক সৌমিত্র শেখর অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের গুচ্ছপদ্ধতির ভর্তি পরীক্ষায় অর্থের বিনিময়ে বহু শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, অর্থের বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং অন্যান্য কর্মচারী নিয়োগের মাধ্যমে তিনি সম্পদ গড়েছেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি শেরপুরে ডুপ্লেক্স বাড়ি ও জমি এবং ঢাকার ধানমন্ডি ও উত্তরায় একাধিক ফ্ল্যাট কিনেছেন তিনি।
samakal