শেয়ারবাজারের সংকট কাটাতে বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ খুঁজতে হবে

শেয়ারবাজারের সংকট কাটাতে বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ খুঁজতে হবে

পুঁজিবাজারের বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণে শুধু সমস্যাগুলো চিহ্নিত করলেই হবে না, বাস্তবসম্মত সমাধানের পথও খুঁজে বের করতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি প্রয়োজন। বাজারের স্থিতিশীলতা ফেরাতে তারল্য বাড়ানো, বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং নতুন পণ্য ও ট্রেডিং কৌশল চালুর ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দেশের শীর্ষ ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) এক বৈঠকে এসব বিষয় উঠে আসে। রাজধানীর নিকুঞ্জে ডিএসইর বোর্ডরুমে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে পুঁজিবাজারের উন্নয়ন এবং ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়।

বৈঠকে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার বলেন, এ সভার মূল উদ্দেশ্য হলো পুঁজিবাজারের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিয়ে অংশীজনদের মতামত ও বাস্তব অভিজ্ঞতা শোনা। তাদের যৌক্তিক ও গঠনমূলক পরামর্শ গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করে প্রয়োজন অনুযায়ী ডিএসইর বোর্ড ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) অবহিত করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, ডেরিভেটিভস মার্কেট চালুর প্রস্তুতি এগিয়ে চলছে। সফটওয়্যারসহ প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি সম্পন্ন করে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। সাম্প্রতিক পাঁচটি ব্রোকারেজ-সংক্রান্ত ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের বিষয়েও ডিএসই কাজ করছে।

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, আলোচনায় মূলত দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। একটি হলো পুঁজিবাজারের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলো, অন্যটি হলো বাজারের বর্তমান কঠিন ও হতাশাজনক পরিস্থিতি। এ পরিস্থিতির কারণ চিহ্নিত করা এবং তা থেকে উত্তরণের উপায় নির্ধারণ করাই আলোচনার অন্যতম উদ্দেশ্য।

সাইফুল ইসলাম বলেন, অতীতের অমীমাংসিত বিষয় এবং বর্তমান বাজার পরিস্থিতি নিয়ে সম্মিলিতভাবে আলোচনা করলে কার্যকর সমাধানের পথ বের করা সম্ভব। অতীত ও বর্তমানের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো তুলে ধরার পাশাপাশি সেগুলোর বাস্তবসম্মত সমাধানের প্রস্তাবও দিতে হবে। শুধু সমস্যা চিহ্নিত করাই যথেষ্ট নয়, সমাধানের পথও খুঁজে বের করতে হবে।

বৈঠকে অংশ নেওয়া ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা বাজারের স্থিতিশীলতা, তারল্য বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে বিভিন্ন প্রস্তাব দেন। তারা দীর্ঘদিনের অনিষ্পন্ন বিষয়গুলো দ্রুত পর্যালোচনা করে বাস্তবভিত্তিক ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দেন।

বক্তারা নতুন ট্রেডিং কৌশল ও পণ্য চালুর পাশাপাশি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা প্রি-ওপেনিং সেশন পুনরায় চালুর কারিগরি ও বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা পর্যালোচনার প্রস্তাব দেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ স্কিমের মেয়াদ ও ঋণ পরিশোধের সময়সীমা বিবেচনায় প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সময় বাড়ানোর বিষয়টিও পর্যালোচনার প্রস্তাব করা হয়।

ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ব্যয় ও তারল্য ব্যবস্থাপনার চাপ কমাতে মেম্বারস মার্জিন নেট-অফের সুযোগ সৃষ্টির প্রস্তাবও দেওয়া হয়।

বৈঠকে ইন্সপেকশন ও সার্ভিলেন্স কার্যক্রম আরও নিয়মিত, তথ্যনির্ভর, ঝুঁকিভিত্তিক ও স্বচ্ছ করার ওপর গুরুত্ব দেন অংশগ্রহণকারীরা। তাদের মতে, সিস্টেমভিত্তিক তথ্য যাচাইয়ের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। স্বাভাবিক ট্রেডিং ভলিউমের পরিবর্তে অস্বাভাবিক মূল্য পরিবর্তন ও প্রকৃত অনিয়মের লক্ষণকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়।

পুঁজিবাজারকে শুধু ইকুইটি নির্ভরতা থেকে বের করে বন্ডসহ অন্যান্য আর্থিক ইন্সট্রুমেন্টের পরিধি বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি ডিলারদের ভূমিকা ও দায়িত্ব নির্ধারণে আরও সুস্পষ্ট নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রণয়নের প্রস্তাব আসে।

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতিগত ও প্রক্রিয়াগত বাধা চিহ্নিত করে তা দূর করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়। এছাড়া বিনিয়োগকারী-কেন্দ্রিক সেমিনার ও সংলাপ আয়োজন এবং উচ্চ সম্পদসম্পন্ন বিনিয়োগকারী ও প্রকৃত মার্কেট প্লেয়ারদের সঙ্গে ডিএসইর সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন বক্তারা।

দেশের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আসতে উৎসাহিত করা এবং দীর্ঘ মেয়াদে শেয়ার বাইব্যাকের সুযোগ চালুর সম্ভাবনা পর্যালোচনার আহ্বানও জানানো হয়।

বৈঠকের শেষ পর্যায়ে নুজহাত আনোয়ার বলেন, ডিএসইর আইটি ও সাংগঠনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা বোর্ড অনুমোদন করেছে। সেটি বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

বিনিয়োগকারী সুরক্ষায় ইন্সপেকশন ও সার্ভিলেন্স কার্যক্রম আরও কার্যকর করতে কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ এবং তথ্যভিত্তিক সফটওয়্যার উন্নয়নে কাজ চলছে বলে জানান তিনি। এতে ইন্সপেকশন প্রক্রিয়া কাঠামোবদ্ধ হবে এবং ডেটা রিকনসিলিয়েশন সহজ হবে।

বিএসইসির উদ্যোগে সিডিবিএল, সিসিবিএল ও আইটি টিমের সমন্বয়ে নিয়মিত সভা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে বলেও জানান ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক। অনলাইনে হিসাব খোলা, খুচরা বিনিয়োগকারীদের সেবা সহজ করা এবং টি+১ সেটেলমেন্টসহ বিভিন্ন বিষয়ে সমন্বিতভাবে কাজ চলছে।

নতুন ওয়েবসাইটের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে জানিয়ে নুজহাত আনোয়ার বলেন, আগামী ২২ সেপ্টেম্বরের প্রেস কনফারেন্সে এটি উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের সুবিধার্থে পুরোনো ওয়েবসাইট আরও দুই থেকে তিন মাস চালু থাকবে। ব্যবহারকারীদের মতামতের ভিত্তিতে নতুন ওয়েবসাইটে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন করা হবে।

তিনি বলেন, ডিএসইর কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করার পাশাপাশি পুরো পুঁজিবাজারের ইকোসিস্টেমের উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করা হবে।

Source: https://www.dhakapost.com/economy/483131

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here