রেলের ১৩৬ বছরের দাসত্বের অবসান

১৮৯০ সালের ব্রিটিশ আইনে এখনো চলছে রেল। বর্তমান সময়ের প্রযুক্তি, নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও যাত্রীসেবার সঙ্গে এসব আইনের অনেক ক্ষেত্রেই সামঞ্জস্যতা নেই। অবৈধ উচ্ছেদ, দুর্ঘটনার তদন্ত, আধুনিক সিগন্যালিং, বেসরকারি বিনিয়োগ ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায় এসব আইন জটিলতা তৈরি করছে। নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বিদ্যমান আইনে অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। রেললাইনে অবাধ চলাচল, অবৈধ ক্রসিং, ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ, সিগন্যাল অমান্য এবং অপরাধের জরিমানার পরিমাণ ও শাস্তির কাঠামো বর্তমান সময়ের সাথে মিল নেই। তাই রেলের ১৩৬ বছরের পুরোনো ব্রিটিশ আইন পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আধুনিক আইন প্রণয়ন হলে ডিজিটাল টিকিটিং, ই-মনিটরিং, স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ব্যবস্থা, উচ্চগতির ট্রেন পরিচালনা, বেসরকারি অংশীদারিত্ব এবং আন্তর্জাতিক রেলপথ পরিচালনার মতো বিষয়গুলো স্পষ্ট আইনি কাঠামোর আওতায় আসবে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনা তদন্ত ও দায় নির্ধারণেও স্বচ্ছতা বাড়বে বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

বর্তমান সময়ে দেশের সড়কপথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ফলে যানজট, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি অপচয় এবং পরিবেশ দূষণ বেড়েই চলেছে। রেলকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে যোগাযোগ ব্যবস্থা গতিশীল হবে। ব্রিট্রিশ আইনে দেশের রেল অবকাঠামো দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও তার পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। তাই নতুন আইনে বেসরকারি অংশগ্রহণের মাধ্যমে সক্ষমতা বাড়বে, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে। তবে পুরো কার্যক্রম সরকারের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী চুক্তির শর্ত নির্ধারণ ও পরিবর্তন করতে পারবে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ রেলওয়ে আইনের সব বিধান প্রযোজ্য হবে। শিল্পাঞ্চল, সমুদ্রবন্দর, স্থলবন্দর এবং কৃষিপ্রধান অঞ্চলগুলোর মধ্যে দ্রুত ও স্বল্প ব্যয়ে পণ্য পরিবহন সম্ভব হবে বলছেন তারা।

রেলসচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম জানিয়েছেন, রেলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে বড় পরিবর্তন আসছে। রেলের ১৩৬ বছরের পুরোনো আইনটি পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নতুন আইন হলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনা করতে পারবে। ১৩৬ বছরের পুরোনো দি রেলওয়েজ অ্যাক্ট, ১৮৯০ বাতিল করে বাংলাদেশ রেলওয়ে আইন, ২০২৬ প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এতে উৎসাহিত করা হবে বেসরকারি খাতকে। নতুন আইনটি প্রণয়ন হলে নির্ধারিত ফি দিয়ে যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনা করতে পারবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। এ জন্য নিজস্ব ইঞ্জিন ও বগিও ব্যবহার করতে পারবে তারা।

জানা যায়, বর্তমান ব্রিটিশ আইনের অনেক ধারা এমন সময়ে প্রণীত হয়েছিল, যখন রেল ছিল মূলত ব্রিটিশ সরকারের প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার একটি মাধ্যম। স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রীসেবা, অর্থনৈতিক করিডোর, মালবাহী পরিবহন, আন্তর্জাতিক সংযোগ এবং উচ্চগতির রেল পরিচালনার জন্য প্রয়োজন আধুনিক ও যুগোপযোগী আইন। ১৮৬২ সালে প্রথম রেলপথ স্থাপন করা হয় দর্শনা থেকে জগতি পর্যন্ত মাত্র ৫৩ কিলোমিটার দীর্ঘ। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ প্রশাসনের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা-পাট, চা, নীলসহ বিভিন্ন কাঁচামাল দ্রুত ও সাশ্রয়ীভাবে বন্দরনগরী কলকাতায় পৌঁছে দেওয়া। ব্রিটিশরা তখন রেলকে দেখেছিল প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক শোষণের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে। ফলে রেললাইন স্থাপন, স্টেশন নির্মাণ, সিগন্যালিং ব্যবস্থা ও পরিচালন কাঠামো সবকিছুই সাজানো হয়েছিল তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী।

রেলওয়ের আরেকটি বড় সমস্যা হলো গেজ বিভাজন। ব্রিটিশ আমলে অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক বিবেচনায় বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন গেজের রেললাইন স্থাপন করা হয় কোথাও ব্রডগেজ, কোথাও মিটারগেজ। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডুয়েল গেজ লাইনের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে তবুও পুরো নেটওয়ার্ক একীভূত করা সম্ভব হয়নি। ফলে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে সরাসরি ট্রেন চলাচলে এখনও নানা জটিলতা রয়ে গেছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের প্রফেসর ড. হাদিউজ্জামান ইনকিলাবকে বলেন, দেশে রেল পরিবহনকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সঙ্গে আধুনিক আইন ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার সমন্বয় অপরিহার্য। ব্রিটিশরা চলে গেছে অনেক বছর হলো। কিন্তু এখনো আমাদের রেল ব্যবস্থা চলছে তাদের আইনেই। সময়ের প্রয়োজনে আমাদের দেশের উন্নয়ন ও উন্নত যোগাযোগের স্বার্থে রেলে নতুন আইন প্রয়োজন। নতুন রেল আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি নতুন যুগের সূচনা হতে পারে। এতে যাত্রীসেবার মান উন্নত হওয়ার পাশাপাশি শিল্প, কৃষি, বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। উত্তরাধিকার পদ্ধতিতে পাওয়া ব্যবস্থা থেকে বেড়িয়ে আসা দরকার। আমরা দেখছি রেলে ঘুরপাক যাতায়াতে বড় সমস্যাটি এখনো বিদ্যমান।

Source: https://dailyinqilab.com/national/article/922639

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here