শহীদুল্লাহ ফরায়জী
১৬ অক্টোবর ২০২৫, বৃহস্পতিবার

রাষ্ট্র কেন জন্ম নেয়? কেন মানুষ স্বেচ্ছায় তার অসীম স্বাধীনতা সীমিত করে সামাজিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়? ইতিহাসের প্রতিটি পর্যায়ে এই প্রশ্নের উত্তর একটি মৌলিক সত্যে এসে ঠেকে-ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা। যদি রাষ্ট্র তার নাগরিকদের নিরাপত্তা, ন্যায্য অধিকার এবং সবার জন্য আইনের শাসন নিশ্চিত করতে না পারে, তবে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব কেবল অর্থহীনই নয়, বরং এটি অত্যাচারের যন্ত্রে পরিণত হয়। একবিংশ শতকের রাজনীতিতে এই সত্য নতুন করে প্রমাণিত হচ্ছে, অপরাধী যেই হোক-রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, উচ্চপদস্থ সামরিক-বেসামরিক আমলা বা সাধারণ নাগরিক, তাকে অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে; অন্যথায় রাষ্ট্র তার নৈতিক ও বৈধভিত্তি হারায়।
অপরাধ ও জবাবদিহিতার সর্বজনীনতা: অপরাধের সঙ্গে যুক্ত কেউ বিচারের বাইরে থাকতে পারে না-এটি শুধু আইন নয়, এটি সভ্যতার মৌলিকচেতনা এবং গণতন্ত্রের মেরুদণ্ড। ক্ষমতার অপব্যবহারকারী বা যুদ্ধাপরাধী-কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল বিশ্বকে দেখিয়েছিল যে-সর্বশক্তিমান শাসক বা যুদ্ধাপরাধী জেনারেলরাও আইনের ঊর্ধ্বে নয়। এটি ক্ষমতাধরদের জবাবদিহিতার এক নতুন মানদণ্ড তৈরি করে।
লাতিন আমেরিকার অভিজ্ঞতা: সামরিক একনায়কতন্ত্র ভেঙে পড়ার পর যখন আর্জেন্টিনা, চিলি বা ব্রাজিলে সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে জবাবদিহিতার প্রক্রিয়া শুরু হয়, তখন জনগণ নতুন আস্থায় রাষ্ট্রকে গ্রহণ করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এই সত্য অটল-মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধী হোক বা রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহারকারী হোক কিংবা দুর্নীতিতে লিপ্ত কোনো গোষ্ঠী হোক-বিচারের বাইরে থাকলে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও নৈতিকতা কলঙ্কিত হবে।
রাষ্ট্রের বৈধতা ও দার্শনিক ভিত্তি: রাষ্ট্রের জন্ম ও তার উদ্দেশ্য নিয়ে দার্শনিকদের ভাবনা সবসময় ন্যায়বিচারকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। থমাস হবস দেখিয়েছিলেন-রাষ্ট্রের প্রধান কাজ হলো নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্যথায় মানুষের জীবন ‘একাকী, জঘন্য, পাশবিক ও সংক্ষিপ্ত’ হয়ে ওঠে। জন লকের মতে-রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য হলো মানুষের স্বাধীনতা ও জন্মগত অধিকার (জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির অধিকার) রক্ষা করা।
জ্যাঁ-জ্যাক রুশো বলেছেন- সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্র গঠনের কথা। যেখানে রাষ্ট্রের কাজ হলো ‘সাধারণ ইচ্ছা’ (General Will)-এর প্রতিফলন ঘটানো, যা সর্বদা ন্যায়সঙ্গত। জন রলস: তার প্রভাবশালী গ্রন্থ ‘A Theory of Justice’-এ বলেছেন-ন্যায়বিচার হলো সমাজের প্রথম গুণ (Justice is the first virtue of social institutions)। তিনি দেখিয়েছেন-রাষ্ট্র যদি ন্যায় থেকে সরে যায়, তাহলে তার আর কোনো বৈধতা থাকে না। কার্ল পপার বলেছেন-গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধান শর্ত হলো-ক্ষমতাবানকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা। আইনের-শাসনের মাধ্যমে রাষ্ট্র প্রমাণ করে যে-ক্ষমতা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর খেয়াল-খুশি নয়, বরং এটি সুনির্দিষ্ট নীতির অধীন।
ঐতিহাসিক শিক্ষা: আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে যে-ন্যায়বিচারের অনুপস্থিতি রাষ্ট্রকে পতনের দিকে নিয়ে যায়। প্লেটো তার ‘The Republic’-এ ন্যায়বিচারকে রাষ্ট্রের মূল গুণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তার শিষ্য এরিস্টটল বলেন-‘যেখানে আইন প্রাধান্য হারায়, সেখানে মানুষ পশুত্বে নেমে যায়।’
ম্যাগনা কার্টা (১২১৫): এই ঐতিহাসিক দলিলটি ইংল্যান্ডের রাজার ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে দেখিয়েছিল যে-রাজাও আইনের ঊর্ধ্বে নন, যা আধুনিক সাংবিধানিক শাসনতন্ত্রের ভিত্তি রচনা করে।
ফরাসি বিপ্লব: এই বিপ্লব জনগণকে শিখিয়েছিল যে-ন্যায়বিচারবিহীন রাষ্ট্র কেবল অত্যাচারের যন্ত্র।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্ব: নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল দেখিয়েছে-অত্যন্ত ক্ষমতাধর রাষ্ট্রপ্রধান এবং সেনাপতিরাও বিচার এড়াতে পারে না।
এসকল ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে-ইতিহাসের প্রতিটি যুগেই রাষ্ট্র কেবল তখনই টিকে থাকে, যখন সে নিজেকে ন্যায়বিচারের সর্বজনীন শর্তে আবদ্ধ করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মই হয়েছিল ন্যায়বিচারের এক ঐতিহাসিক দাবি থেকে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT)-এর মাধ্যমে ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়া-আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও ন্যায্যতার দিক থেকে সমালোচিত হওয়া সত্ত্বেও, কৌশলগতভাবে ছিল ঐতিহাসিক দায়মুক্তি অবসানের একটি রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টা। বর্তমান ট্রাইব্যুনাল প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তি, গোষ্ঠী, গণহত্যাকারী কিংবা যুদ্ধাপরাধে যুক্ত সামরিক কর্মকর্তাদেরকেও বিচারের আওতায় এনেছে। এটি দেখিয়েছে যে-রাষ্ট্র যদি সত্যিই তার জনগণের আস্থা পেতে চায়, তবে অপরাধী যেই হোক-ক্ষমতাবান বা দুর্বল-সবাইকে আইনের কাছে সমান হতে হবে। বাংলাদেশে এই ট্রাইব্যুনাল কেবল অতীতের অন্যায়ের বিচারই করেনি, বরং ভবিষ্যতের জন্য রাষ্ট্রের নৈতিকভিত্তিকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বিচার বহির্ভূততার পরিণতি: যখন রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে আইনের বাইরে রাখে, তখন সমাজে তিনটি গুরুতর ও ভয়াবহ সমস্যা দেখা দেয়:-
১. অন্যায়ের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ: অপরাধী পুরস্কৃত হয়, আর ভুক্তভোগী ন্যায় থেকে বঞ্চিত হয়ে দ্বিগুণ শাস্তির শিকার হয়। এতে সমাজে ভয় ও শৃঙ্খলার অভাব তৈরি হয়।
২. জনআস্থার ভাঙন (Crisis of Trust): মানুষ বিশ্বাস হারায় যে-রাষ্ট্র তাদের রক্ষা করবে। যখন জনগণ বিচারালয় বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন রাষ্ট্রের বৈধতা ক্ষুণ্ন হয়।
৩. অরাজকতার জন্ম (Anarchy): যখন ন্যায় নেই, তখন মানুষ বিকল্পশক্তির সন্ধান করে। ফলে প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা মাফিয়াতন্ত্রের জন্ম হয়। এতে করে রাষ্ট্র নিজেই দুর্বল হয়ে পড়ে এবং আইনের শাসন ভেঙে যায়।
ন্যায়বিচারই রাষ্ট্রের প্রাণশক্তি: রাষ্ট্রের কল্যাণ, উন্নয়ন কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সবই গৌণ হয়ে যায়, যদি ন্যায় না থাকে। যে-উন্নয়নের ভিত্তি ন্যায়হীনতার ঘেরাটোপে আবদ্ধ, তা কখনোই টেকসই হতে পারে না। একমাত্র ন্যায়বিচারই রাষ্ট্রকে জনগণের চোখে বৈধ রাখে এবং জনসমর্থন নিশ্চিত করে। ন্যায়বিচারের মাধ্যমেই জনগণ রাষ্ট্রকে নিজের মনে করে, আর রাষ্ট্র জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকে। এ সম্পর্ক ভেঙে গেলে রাষ্ট্র কেবল ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর শোষণযন্ত্রে পরিণত হয়।
অপরাধী যেই হোক-রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান, রাষ্ট্রীয় সংস্থা, সামরিক-বেসামরিক আমলা, ব্যবসায়িক মহল বা কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী- কেউই বিচারের ঊর্ধ্বে নয়। রাষ্ট্র যদি কাউকে আইনের বাইরে রাখে, তবে রাষ্ট্রের দার্শনিক প্রয়োজনীয়তাই শেষ হয়ে যায়। তাই চূড়ান্ত সত্যটি হলো-ন্যায়বিচারই রাষ্ট্রের অস্তিত্বের অপরিহার্য ভিত্তি।
লেখক: গীতিকবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
faraiæees@gmail.com
Source: https://mzamin.com/news.php?news=184936#gsc.tab=0









