মিয়ানমারের গৃহদাহে বাংলাদেশ ‘চা পড়া’ খাবে?

শেখ রোকন : মিয়ানমারবিষয়ক দুই সুপরিচিত বিশেষজ্ঞ ডাচ কূটনীতিক লাতিশিয়া ফন ডেন আসুম ও থাই কূটনীতিক কোবসাক চুটিকুল যৌথভাবে একটি নিবন্ধ লিখেছেন বুধবারের ব্যাংকক পোস্টে। আজ রোববার থেকে লাওসের প্রাচীন রাজধানী লুয়াঙ প্রাবাঙে শুরু হওয়া আসিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের দু’দিনব্যাপী বৈঠক সামনে রেখে তারা আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমার সংকট নিয়ে কোনো স্পষ্ট পথ দেখাতে পারছে না। এখনও ‘চা পড়া’ খেয়ে যাচ্ছে।

ইংরেজি ভাষার ‘চা পড়া’ প্রবচনের উৎস প্রাচীন চীন। তখন গরম পানিভর্তি কাপে চায়ের পাতা দিয়ে কাউকে পান করতে বলা হতো। তার পর তলানিতে চায়ের পাতাগুলো পড়ে থাকার নকশা দেখে গুনিনরা তার ভবিষ্যৎ গণনা করে দিতেন। কিন্তু নাফ নদের ওপারের পরিস্থিতি এতটাই স্পষ্ট, ভবিষ্যদ্বাণী করতে চা পড়া প্রয়োজন হয় না।

গত ২৭ অক্টোবর ‘অপারেশন ১০২৭’ শুরুর পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা হারাচ্ছে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা। বাংলাদেশের সীমান্তলাগোয়া চিন ও রাখাইন স্টেটেও পরিস্থিতি তথৈবচ। বিশেষত রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইন স্টেটে রাজধানী শহর ‘সিত্তে’ বা প্রাচীন আকিয়াব ছাড়া বাকি অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে সামরিক বাহিনী। রাখাইন ও চিন স্টেটের ‘প্রাণপ্রবাহ’ কালাদান নদীর উজানে পলেটু ও মোহনায় পকটু শহরের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে গোটা অঞ্চলেই সামরিক জান্তার অস্ত্রশস্ত্র ও রসদ পরিবহন কঠিনতর হয়ে পড়েছে।

অভিযানটির তিন মাস পূর্তি উপলক্ষে মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যম ‘ইরাবতী’ সামরিক জান্তার ভূমি, অস্ত্র ও জনবল হারানোর হিসাব প্রকাশ করেছে। দেখা যাচ্ছে, মিয়ানমারে ৭৪টি ‘টাউন’ বা জেলা সদরের অন্তত ৩৬টি এবং ৩২৫টি ‘টাউনশিপ’ বা উপজেলা সদরের মধ্যে দেড় শতাধিক এখন বিদ্রোহীদের দখলে। এসব দখল-পুনর্দখল লড়াইয়ে সামরিক বাহিনী তিনটি যুদ্ধবিমান, চারটি সামরিক কপ্টার, আটটি ট্যাঙ্ক, ১৬টি সাঁজোয়া যান, ২০টি কামান, দুটি রকেট লঞ্চার, বিপুল পরিমাণ হালকা ও মাঝারি অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ হারিয়েছে। অন্তত ছয়জন ব্রিগেডিয়ার জেনারেলসহ দুই শতাধিক উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাও আত্মসমর্পণ করেছেন।

মাঝে যদিও চীনের মধ্যস্থতায় দু’পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতির কথা শোনা গিয়েছিল, কার্যত সেটি টেকসই হয়নি। গত বৃহস্পতিবার মিয়ানমারে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত চেন হাই সামরিক জান্তার তিন মন্ত্রীর সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেছেন। কেবল মিয়ানমারে ‘প্রভাববলয়’ নিয়ে নয়; রাখাইন স্টেটে চীনা অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্পের নিরাপত্তাও চায় বেইজিং। রোহিঙ্গা ইস্যু যে তাদের আলোচ্য ছিল না, সেটি বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই।

ভূরাজনৈতিক দিক থেকে চীন ছাড়াও মিয়ানমারের সরাসরি প্রতিবেশীগুলোর মধ্যে রয়েছে– বাংলাদেশ, ভারত, থাইল্যান্ড ও লাওস। এর মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ সীমান্ত থাইল্যান্ডের সঙ্গে ২ হাজার ৪০০ কিলোমিটার। চীনের মতোই সীমান্তবর্তী শান স্টেটের সঙ্গে রয়েছে নৃতাত্ত্বিক যোগসূত্র। যে তিন বিদ্রোহী গোষ্ঠী নিয়ে গঠিত ‘ভ্রাতৃ জোট’ অক্টোবর থেকে ‘অপারেশন ১০২৭’ পরিচালনা করছে, তার অন্যতম ‘টাঙ ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি’ বা টিএনএলএ থাইল্যান্ডেরও বাসিন্দা। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী পারনপ্রি বাহিদ্ধা-নুকারা গত সপ্তাহে ব্যাংকক পোস্টে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলেছেন, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর উচিত মিয়ানমার পরিস্থিতিতে সম্পৃক্ত হওয়া। সেখানে যদিও তিনি বাংলাদেশেরও নাম নিয়েছেন, কার্যত দেশটির অভ্যন্তরে সাধারণ নাগরিকের জন্য ‘মানবিক সহায়তা’ বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। সীমান্ত পার হয়ে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ কিছু বলেননি।

ভারতের সঙ্গেও মিয়ানমারের রয়েছে দীর্ঘ সীমান্ত– ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার। নয়াদিল্লি যদিও শুরু থেকেই নেপিদোর সামরিক সরকারকে সমর্থন দিয়ে আসছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে অবস্থান বদলের লক্ষণ স্পষ্ট। নভেম্বরেই ভারতের মিজোরামের সঙ্গে মিয়ানমারের চিন স্টেটের একমাত্র সড়ক সংযোগ টিয়াউ নদীর ওপরের বেইলি ব্রিজটি সেখানকার বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘চিনল্যান্ড ডিফেন্স ফোর্স’ দখলে নিয়েছিল। ভারত তাদের সঙ্গেই দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে গেছে। প্রথম দিকে যদিও মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর সীমান্ত অতিক্রমকারী সদস্যদের আশ্রয় বা মণিপুর দিয়ে নিরাপদ এলাকায় পার করে দিচ্ছিল; এখন বলছে সীমান্ত বন্ধ করে দেবে। প্রয়োজনে সীমান্তজুড়ে কাঁটাতারের বেড়া হবে। অর্থাৎ, সামরিক জান্তার খাতির ফুরিয়েছে ভারতের কাছে।

আসিয়ানের বর্তমান চেয়ারম্যান লাওসও সক্রিয় হয়েছে। মিয়ানমারের প্রতিবেশী দেশগুলো নিজেদের মতো করে এগোচ্ছে। দেশটির পররাষ্ট্রবিষয়ক উপমন্ত্রী আলোংকিও কিত্তিখনকে মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত নিয়োগ এবং ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের একই বিষয়ক দুই বিশেষ দূতের সমন্বয়ে ‘ট্রয়কা’ গঠন করা হয়েছে। তিনি ১০ জানুয়ারি মিয়ানমার জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন। মিয়ানমারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রতিবেশীরা সবাই যখন যার যার মতো সক্রিয়, এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কী করবে? রোহিঙ্গা ইস্যুতে ঢাকা প্রথম থেকেই জাতিসংঘের দিকে বিশেষভাবে তাকিয়ে ছিল। কিন্তু ক্রমেই প্রভাব খুইয়ে ফেলা সংস্থাটি বর্তমানে ইউক্রেন ও গাজা পরিস্থিতি নিয়ে এতটাই ব্যতিব্যস্ত, মিয়ামনারবিষয়ক বিশেষ দূতের পদ ছয় মাস ধরে খালি থাকলেও পূরণ করার সময় পাচ্ছে না।

এটা সত্য, নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ দায়িত্ব নিয়েই মিয়ানমার ইস্যুতে দৃশ্যত সক্রিয় হয়েছেন। উগান্ডার রাজধানী কাম্পালায় সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ১৯তম ন্যাম সম্মেলনের ফাঁকে মিয়ানমারের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পরাষ্ট্রমন্ত্রী থান শোয়ের সঙ্গে তিনি একটি বৈঠক করেছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বৈঠকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনসহ অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে কথা হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর আনুষ্ঠানিক বক্তব্যেও রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে ব্যাপক উদ্যোগী হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন (বাসস, ২০ জানুয়ারি ২০২৪)। অবশ্য মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে বৈঠকটি নিয়ে যে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে, সেখানে রোহিঙ্গা ইস্যুর উল্লেখ নেই। বাংলাদেশ ছাড়াও আরব আমিরাত ও উগান্ডার পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে পৃথক বৈঠকের বিষয়বস্তু সম্পর্কে ‘দ্য গ্লোবাল নিউ লাইট অব মিয়ানমার’ বলছে, ‘মিয়ানমারের সর্বসাম্প্রতিক পরিস্থিতি এবং শান্তি, উন্নয়ন ও গণতন্ত্র সম্পর্কে সরকারের উদ্যোগের ব্যাপারে তাদের জানানো হয়েছে।’ (২২ জানুয়ারি ২০২৪)।

তার মানে, বেকায়দা সত্ত্বেও মিয়ানমার জান্তার এখনও রোহিঙ্গা ইস্যুতে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি নেই। এ ক্ষেত্রে রাখাইনে ও বাকি মিয়ানমারে শক্তিশালী হয়ে ওঠা বিদ্রোহী গোষ্ঠী কিংবা প্রবাসে গঠিত ‘জাতীয় ঐক্য’ সরকারের সঙ্গে রোহিঙ্গা ইস্যুতে সমান্তরাল যোগাযোগ বা আলোচনায় দেরি কেন? চীন ও ভারত তো বটেই, থাইল্যান্ড ও লাওসের মতো প্রতিবেশীরাও যে সেই পথে অগ্রসর হচ্ছে, সেটি সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে স্পষ্ট। ১৩-১৪ লাখ রোহিঙ্গার বোঝা মাথায় নিয়ে হিমশিম খাওয়া বাংলাদেশের পক্ষে বসে থাকার অবকাশ নেই।

মিয়ানমারে সম্ভাব্য পরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে যদি আসন্ন ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিয়ে বোঝাপড়া না করা যায়, তাহলে ক্ষমতা পরিবর্তনের পর বিষয়টি ফের ঝুলে যেতে পারে। ২০১০ সালের নভেম্বরে অং সান সু চির মুক্তি এবং ২০১২ সালের জানুয়ারিতে উপনির্বাচনের মাধ্যমে বিরোধীদলীয় নেতা কিংবা সেখান থেকে ২০১৬ সালের এপ্রিলে ক্ষমতায় যাওয়ার আগ পর্যন্ত পাঁচ বছরের বেশি সময় হাতে পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশে বিপুল জনপ্রিয় সু চির পূর্ণ ক্ষমতা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত উল্টো ফল হয়েছে।
এবারও ‘চা পড়া’ কী বলে, সেটা দেখতে গিয়ে দেরি করার সুযোগ নেই।

সমকাল