বিদেশে সম্পদ থাকা সেই মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী

বিদেশে সম্পদ থাকা সেই মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীকোলাজ

একজন মন্ত্রীর বিদেশে ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ ও ব্যবসা রয়েছে বলে গত মঙ্গলবার ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) তথ্য  দিয়েছিল। তিনি হলেন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। সমকালের নিজস্ব অনুসন্ধানে সাইফুজ্জামান নিজে পরিচালক এমন আটটি রিয়েল এস্টেট কোম্পানির তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া নিশ্চিত হওয়া গেছে, টিআইবির কাছে ভূমিমন্ত্রীর বিষয়েই তথ্যপ্রমাণ রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করে ও বিস্তারিত তথ্য না দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি জানিয়েছিল, এক মন্ত্রীর বিদেশে ছয় কোম্পানিতে বিনিয়োগ রয়েছে। এসব কোম্পানির সম্পদের মূল্য ১৬ কোটি ৬৪ লাখ পাউন্ড, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ২ হাজার ৩১২ কোটি টাকা। এসব সম্পদের তথ্য তিনি নির্বাচনী হলফনামায় গোপন করেছেন। গত মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা ওই মন্ত্রীর নাম, কোন দেশে তাঁর বিনিয়োগ আছে এবং কোম্পানিগুলোর নাম জানতে চেয়েছিলেন। তবে টিআইবি নাম প্রকাশ না করে বলেছিল, সরকারের কোনো সংস্থা চাইলে তারা তথ্যপ্রমাণ দেবে।

সরকারের কোনো সংস্থা চাইলে টিআইবি তথ্য দেবে বলা হলেও গতকাল বুধবার পর্যন্ত কোনো সংস্থা বা দুদক এ বিষয়ে কোনো তথ্য চায়নি। তবে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) একজন কর্মকর্তা সমকালকে জানান, অনুমোদন ছাড়া বিদেশে বিনিয়োগ করা বেআইনি। নির্বাচনের পর তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন।

ভূমিমন্ত্রী জাবেদ এবারও চট্টগ্রাম-১৩ আসন থেকে জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি নির্বাচন কমিশনে যে হলফনামা জমা দিয়েছেন, এতে যুক্তরাজ্যে তাঁর আট কোম্পানির বিনিয়োগের তথ্য উল্লেখ করেননি। নির্বাচনী আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী নির্বাচনের হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিলে বা সম্পদের তথ্য গোপন করলে, নির্বাচনের আগে এ বিষয়ে তথ্যপ্রমাণ মিললে তিনি প্রার্থী থাকার যোগ্যতা হারাবেন। নির্বাচিত হওয়ার পরও হলফনামায় সম্পদের তথ্য গোপন করলে সংসদ সদস্যপদ বাতিল হয়।

এসব বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য সাইফুজ্জামান চৌধুরীর মোবাইল ফোনে কল করলে তিনি ধরেননি। পরে সমকালের প্রতিবেদক পরিচয় দিয়ে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।

কোন কোম্পানির সম্পদমূল্য কত 

সাইফুজ্জামান চৌধুরী লন্ডনে নিউ ভেঞ্চার (লন্ডন) লিমিটেড নামে প্রথম কোম্পানি খোলেন ২০১০ সালের ১৩ জুলাই। সর্বশেষ ২০২১ সালের ২২ জুলাই সাদাকাত প্রপার্টিজ লিমিটেড নামে কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। এসব কোম্পানির সবই রিয়েল এস্টেট বা আবাসন খাতের। সব কোম্পানি ৮ ডেভোনশায়ার স্কয়ার, লন্ডনের একই ঠিকানায়।

যুক্তরাজ্য সরকারের ওয়েবসাইট ঘেঁটে দেখা যায়, ২০১০ সালে খোলা নিউ ভেঞ্চার (লন্ডন) লিমিটেড নামে কোম্পানির মূল ব্যবসা বাড়িঘর কেনাবেচা। গত ২৩ জুন কোম্পানির পক্ষে দাখিল করা নথি অনুযায়ী, স্থায়ী ও চলতি সম্পদের মোট মূল্য ১ কোটি ১৭ লাখ পাউন্ড। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ১৬৪ কোটি টাকা। জেডটিএস প্রপার্টিজ নামে দ্বিতীয় কোম্পানি খুলেছিলেন ২০১৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি। চলতি বছরের ২৬ মে কোম্পানিটির ৩১ মার্চ, ২০২২ সমাপ্ত বছরের যে আর্থিক প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে, তাতে এর মোট স্থায়ী ও চলতি সম্পদ দেখানো হয়েছে ৭ কোটি ৩১ লাখ পাউন্ড, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ১ হাজার ২৩ কোটি টাকা। ২০১৯ সালের ৬ জুলাই তাঁর স্ত্রী রুখমিলা জামানের নামে রুখমিলা প্রপার্টিজ নামে কোম্পানি খোলেন। রুখমিলা জামান বর্তমানে বেসরকারি ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) চেয়ারম্যান। গত ৩১ জুলাই ২০২২ সমাপ্ত হিসাব বছরের তথ্য অনুযায়ী, রুখমিলা প্রপার্টিজের মোট স্থায়ী ও চলতি সম্পদ দেখানো হয়েছে ২ কোটি ৮০ লাখ পাউন্ড, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৩৯১ কোটি টাকা।

আরামিট প্রপার্টিজ নামে চতুর্থ কোম্পানি খোলা হয়েছে ২০২০ সালের ৬ মে। চলতি বছরের ৭ সেপ্টেম্বর এ কোম্পানির ৩১ মে ২০২২ সমাপ্ত হিসাব বছরের আর্থিক প্রতিবেদন সরকারি সংস্থায় জমা দেওয়া হয়েছে। এ কোম্পানির মোট সম্পদ ২ কোটি ১৫ লাখ পাউন্ড। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ৩০১ কোটি টাকা।

জেডটিজেড প্রপার্টিজ নামের পঞ্চম কোম্পানি খোলা হয়েছে ২০২০ সালের ৩০ জুলাই। চলতি বছরের ১২ সেপ্টেম্বর এ কোম্পানির ৩১ জুলাই ২০২২ সমাপ্ত হিসাব বছরের আর্থিক প্রতিবেদন সরকারি সংস্থায় জমা দেওয়া হয়েছে। তাতে কোম্পানির মোট সম্পদ ২ কোটি ৯৯ লাখ পাউন্ড দেখানো হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ৪১৮ কোটি টাকা।

মন্ত্রী তাঁর মেয়ে জেবা জামানের নামে জেবা প্রপার্টিজ নামে কোম্পানি খুলেছেন ২০২১ সালের ২১ জুন। গত ৩০ জুন ২০২২ সমাপ্ত হিসাব বছরের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই কোম্পানির মোট সম্পদ ১ কোটি ২৯ লাখ পাউন্ড। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ১৮০ কোটি টাকা। জারিয়া প্রপার্টিজ নামে আরেক কোম্পানির ৩০ জুন ২০২২ সমাপ্ত হিসাব বছরের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী সম্পদ ৬০ লাখ পাউন্ড, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৮৪ কোটি টাকা।

মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী লন্ডনে সর্বশেষ যে কোম্পানিটি খুলেছেন বলে সমকাল তথ্য পেয়েছে, তার নাম সাদাকাত প্রপার্টিজ লিমিটেড। কোম্পানিটি খোলা হয়েছে ২০২১ সালের ২২ জুলাই। গত ৩১ জুলাই ২০২২ সমাপ্ত হিসাব বছরের আর্থিক প্রতিবেদন যুক্তরাজ্য সরকারের দপ্তরে জমা দেওয়া হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাদাকাত প্রপার্টিজের সম্পদমূল্য প্রায় ২ কোটি পাউন্ড। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ২৭৯ কোটি টাকা।

জাতীয়তা বাংলাদেশি, আবাসস্থল যুক্তরাজ্য

যুক্তরাজ্যের সরকারি ওয়েবসাইটে ২০১০ সালে খোলা প্রথম কোম্পানি নিউ ভেঞ্চারের তথ্যে মালিকদের মধ্যে নাম রয়েছে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর। তাঁর জাতীয়তা বাংলাদেশি, আবাসস্থলও বাংলাদেশ এবং জন্মতারিখ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯। তাঁর পেশা ব্যবসা। সাইফুজ্জামান ছাড়াও এ কোম্পানিতে ব্রিটেনের নাগরিক ইসমাইল মুফিট আলাকসু নামে একজন পরিচালক রয়েছেন। এ ছাড়া আলী সাফাক ওজতুর্ক নামে একজন তুর্কি-ব্রিটিশ এবং উফউক ওজতুর্ক নামে একজন ব্রিটিশ বিনিয়োগকারীর তথ্য রয়েছে।

বাকি সাত কোম্পানির সবটিতে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর জাতীয়তা বাংলাদেশি বলে উল্লেখ রয়েছে এবং ছয়টিতে তিনি একাই পরিচালক। জেডটিএস প্রপার্টিজ, রুখমিলা প্রপার্টিজ, আরামিট প্রপার্টিজ এবং জেডটিজেড প্রপার্টিজে আবাসস্থল হিসেবে যুক্তরাজ্য উল্লেখ রয়েছে। বাকি তিন কোম্পানি জেবা প্রপার্টিজ, জারিয়া প্রপার্টিজ এবং সাদাকাত প্রপার্টিজে আবাসস্থল বাংলাদেশ উল্লেখ রয়েছে। রুখমিলা প্রপার্টিজে সাইফুজ্জামান চৌধুরী ছাড়াও তাঁর স্ত্রী রুখমিলা জামান পরিচালক।

এসব কোম্পানির সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, নিউ ভেঞ্চার, জেবা প্রপার্টিজ, জারিয়া প্রপার্টিজ এবং সাদাকাত প্রপার্টিজের প্রতিটির শেয়ার ক্যাপিটাল ১০০ পাউন্ড করে মোট ৪০০ পাউন্ড। আর রুখমিলা প্রপার্টিজের শেয়ার ক্যাপিটাল ৫ পাউন্ড। জেডটিএস প্রপার্টিজের শেয়ার ক্যাপিটাল ১ হাজার পাউন্ড। বাকি দুইটির এক পাউন্ড করে মোট ২ পাউন্ড। অর্থাৎ আট কোম্পানির শেয়ার ক্যাপিটাল ১ হাজার ৪০৭ পাউন্ড।

হলফনামায় যা আছে

সাইফুজ্জামান চৌধুরী হলফনামায় বলেছেন, ২০২২-২৩ আয়বর্ষ শেষে তাঁর মোট সম্পদমূল্য ছিল ১৮ কোটি ৮৫ লাখ ৭৮ হাজার টাকা, যা এর আগের বছর ছিল ১৭ কোটি ২২ লাখ ৭০ হাজার টাকা। তিনি গত বছর ৭৪ লাখ ১২ হাজার টাকা আয় করেছেন। হলফনামায় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি ও তাঁর স্ত্রী রুখমিলা জামানের নামে মোট ২৪ কোটি ১৮ লাখ টাকার অস্থাবর এবং ক্রয়মূল্যের হিসাবে ১২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা মূল্যের অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। এর বাইরে অন্য কোনো সম্পদ নেই।

সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই দুদকের কাছে

দুদক কমিশনার মো. জহুরুল হক সমকালকে বলেন, যুক্তরাজ্যে এক মন্ত্রীর ছয় কোম্পানিতে বিনিয়োগ বিষয়ে দুদকের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত উল্লেখ করে কমিশনে অভিযোগ দেওয়া হলে সেটা আমলে নিয়ে অনুসন্ধান করা হবে। দুদক ভাসা ভাসা তথ্যের ওপর অনুসন্ধান করে না। তথ্য-প্রমাণ উল্লেখ করে গণমাধ্যমে রিপোর্ট প্রকাশ হলেও তা যাচাই করে অনুসন্ধানের জন্য আমলে নেওয়া হবে। দুদক টিআইবির কাছে তথ্য, প্রতিবেদন চেয়ে কোনো চিঠি দেবে কিনা– এ প্রশ্নে কমিশনার বলেন, তারা টিআইবির কাছে লিখিতভাবে কোনো তথ্য চাইবেন না। টিআইবি নিজের উদ্যোগে তথ্য পাঠালে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হবে।

দুদক সচিব ও দুদক মুখপাত্র মো. মাহবুব হোসেন সমকালকে বলেন, টিআইবির প্রকাশ করা তথ্য আমলে নিয়ে অনুসন্ধান করা হবে, কি হবে না– এ ব্যাপারে বুধবার পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সিদ্ধান্ত হলে প্রয়োজনে গণমাধ্যমকে জানানো হবে।

টিআইবির বক্তব্য

সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের লন্ডনে আট কোম্পানির তথ্য পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান সমকালকে বলেন, ‘টিআইবি একাধিক উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই করেছে। ফলে এ ক্ষেত্রে তথ্য কিছুটা কম-বেশি থাকতে পারে। বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো সংস্থা টিআইবির কাছে তথ্য চেয়ে যোগাযোগ করেছে কিনা– এমন প্রশ্নে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘আমরা অপেক্ষায় আছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত এমন কেউ তথ্য চায়নি।’ নির্বাচনের পর এ নিয়ে বিএফআইইউ কাজ করবে– এমনটি জানালে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে ও পরের বিষয়টি বিএফআইইউর কাছে মোটেই বিবেচ্য হওয়ার কথা নয়। অবৈধ লেনদেন বা পাচার বিষয়ে তথ্য পাওয়ার সুযোগ থাকলে ব্যক্তির পরিচয় বা প্রেক্ষাপট, এগুলোর কোনোটাই দেখার কথা নয়। হলফনামায় তথ্য গোপনের কারণে সাইফুজ্জামান চৌধুরী আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্যতা রাখেন কিনা– এমন প্রশ্নে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এটা তো সহজ বিষয়। কেউ আইন অনুযায়ী, হলফনামায় আবশ্যকীয় তথ্য গোপন করলে প্রার্থিতার অযোগ্য হবেন। নির্বাচন কমিশনও চাইলে সহজে এ তথ্য যাচাই করতে পারে।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ওই মন্ত্রী বিদেশে যে বিনিয়োগ করেছেন, তা কি তাঁর বৈধ আয়, নাকি অবৈধ আয়– এটা প্রথম প্রশ্ন। দ্বিতীয়ত, তিনি কী করে বিদেশে এত টাকা নিলেন? সরকারের নিজের স্বচ্ছতার স্বার্থে এ বিষয়ে অনুসন্ধান করা উচিত। তবে সবার আগে দায়িত্বশীল সংস্থা বিএফআইইউ, দুদক এবং নির্বাচন কমিশনের এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মত দেন তিনি।

সমকাল