নির্বাচনকে ভোটারবিহীন করার কৌশল বিএনপির

নির্বাচনকে ভোটারবিহীন করার কৌশল বিএনপির 

আসন্ন সংসদ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের ওপর নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই আজ মঙ্গলবার সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতালনের ডাক দিয়েছে বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো। সরকার পতনের এক দফা দাবি এবং ‘একতরফা ও প্রহসনে’র নির্বাচনের তপশিল বাতিলের দাবিতে এ কর্মসূচি পালন করবে তারা। একই দাবিতে চলমান কর্মসূচিতে ‘ভিন্নতা’ এনে আন্দোলন অব্যাহত রাখবে বিরোধী দলগুলো। রাজপথের আন্দোলনে ‘শক্ত প্রতিরোধ’ গড়ে তোলার পাশাপাশি নির্বাচনকে ‘ভোটারবিহীন’ করতে নিয়েছে নানা উদ্যোগ।

দলীয় সূত্র জানায়, সাধারণ মানুষের কাছে নির্বাচনকে ‘তামাশা ও অর্থহীন’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করবে দীর্ঘ ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা বিরোধী দলটি। ভোটদানে নিরুৎসাহিত করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ ভিন্ন কৌশলে ব্যাপক কার্যক্রম চালাবেন দলটির সর্বস্তরের নেতাকর্মী। রাজপথে আন্দোলনকে আরও জোরদার করতে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনসহ বাম ঘরানার দলকেও ঐক্যবদ্ধভাবে একই কর্মসূচি পালন করার ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আজ হরতাল শেষে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা  করবে তারা। সেখান থেকে অবরোধের মতো নতুন কর্মসূচি দিতে পারে।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সমকালকে বলেন, একাত্তরের চেয়েও ভয়াবহ একটা সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রিয় মাতৃভূমি। এখানে দেশের ১৮ কোটি মানুষ এবং গণতান্ত্রিক বিশ্বের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে আওয়ামী ডামি, আওয়ামী স্বতন্ত্র, আওয়ামী নৌকা, মনোনীত নৌকা, অনুমতিক্রমে স্বতন্ত্র, বিদ্রোহী নৌকা আওয়ামী জোট, আওয়ামী পার্টির এক অদ্ভুত বা কিম্ভূতকিমাকার নির্বাচনের আয়োজন চলছে। এক ক্লাবের খেলা চলছে। খেলোয়াড়ও একই দলের। যেটা লাউ, সেটাই কদু। নিজেরাই নিজেদের বিরোধী দল। এই নির্বাচনে জনগণের কোনো অংশগ্রহণ থাকবে না। তিনি জনগণকে নির্বাচন বর্জনের আহ্বান জানান।

বিএনপিসহ নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত প্রায় ৬৩টি রাজনৈতিক দল আগামী ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন বর্জন করেছে। নির্দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও সবার অংশগ্রহণে নির্বাচনের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছে এসব দল। ‘একতরফা’ নির্বাচনের বিরুদ্ধে রাজপথের আন্দোলন ও নির্বাচনবিরোধী প্রচারণা চালাচ্ছে তারা। অন্যদিকে নিবন্ধিত ২৭টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনী ট্রেনে যাত্রা শুরু করেছে। গতকাল সোমবার নির্বাচনী প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই শুরু হয়েছে নির্বাচনী প্রচারণা। নির্বাচনে অংশ নেওয়া মিত্র জাতীয় পার্টি ও শরিক ১৪ দলের সঙ্গে আসন সমঝোতাও করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।

বিএনপির নেতাকর্মীরা জানান, নির্বাচনে আসন ভাগাভাগি থেকে শুরু করে ‘কিংস পার্টি’র তৎপরতা, ডামি প্রার্থী, স্বতন্ত্র প্রার্থী নিয়ে যেসব আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে, সেসবকে আরও প্রচারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে বিএনপিসহ সমমনা অন্যান্য দলের পক্ষ থেকে জনগণের উদ্দেশে ভোট বর্জনের আহ্বান জানানো হয়েছে। তারা এ নির্বাচনকে ‘বানরের রুটি ভাগাভাগি’ ছাড়াও ‘ভাগবাটোয়ারা’র নির্বাচন বলে প্রত্যাখান করতে ভোটারদের ভোটদানে বিরত থাকতে বলেছে।

জানা গেছে, নির্বাচনকে প্রতিহত করতে এবং জনমত তৈরি করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব প্রচারণাকে গুরুত্ব দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে বিভিন্ন ডকুমেন্টারি। এতে ‘একতরফা’ নির্বাচনে জনগণের ক্ষমতায়নে নেতিবাচক প্রভাব, ভোটাধিকার হরণ, আন্তর্জাতিক বিশ্বে নেতিবাচক সম্পর্ক তৈরির আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে এই ‘বিতর্কিত’ নির্বাচনের প্রভাবে দেশের শিল্প-বাণ্যিজ্যে ‘পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার’ শঙ্কা রয়েছে বলেও সতর্ক করা হচ্ছে জনগণকে। সেখানে বিভিন্ন ‘নিমো’ তৈরি করে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগ নেতাদের বিতর্কিত বক্তব্য, বিরোধী দলের নেতাকর্মীর ওপর নির্যাতনের চিত্র, মামলা-হামলা আর আদালত কর্তৃক ‘ফরমায়েশি’ সাজা দেওয়ার ঘটনাও থাকবে।

বিএনপি নেতারা জানান, দেশের তরুণ ও যুব শ্রেণির একটি বিশাল অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব। সেখানেই মূলত তাদের মাধ্যমে দেশের প্রকৃত চিত্র দেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। দলের প্রতিটি নেতাকর্মী ওই কর্মসূচিতে সরব ভূমিকা পালন করছেন এবং অন্যদেরও সেখানে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে সারাদেশে মামলা ও গ্রেপ্তার অতঙ্কে বিরোধী দলের নেতাকর্মীর মানবেতর জীবন, ঘরবাড়ি ছাড়ার দৃশ্য, স্বজনদের হয়রানি করার ঘটনাসহ আরও অনেক আলোকচিত্র, ভিডিও, পরিবারের সদস্যদের আহাজারি ও কান্নার দৃশ্যগুলোকে প্রচারণায় নিয়ে আসা হয়েছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য দল ও জোটের ভেরিফায়েড ফেসুবক, টুইটার, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব প্রচারণা চলছে। এর বাইরেও নেতাকর্মীর অ্যাকাউন্ট থেকেও ‘একতরফা’ নির্বাচনের বিরুদ্ধে চলছে প্রচার।

দলীয় সূত্র জানায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বাইরে প্রত্যেক নেতাকর্মীর আত্মীয়স্বজন এমনকি বন্ধুবান্ধব ও প্রতিবেশী সমাজকে এই ‘একতরফা’ নির্বাচনের বিরুদ্ধে সরব করতে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন উদ্যোগ। এই নির্বাচনের ফলে দেশের ভবিষ্যৎ কি হতে পারে– সেসব বিষয়ে সতর্ক করা হচ্ছে তাদের। দেশে গণতন্ত্রের প্রয়োজনে, আগামীর প্রজন্মের জন্য নিরাপদ রাষ্ট্র আর সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রতিবাদ করার জন্যও আহ্বান জানানো হচ্ছে।

রাজপথেও গড়ে তোলা হবে ‘শক্ত প্রতিরোধ’
রাজপথে ‘শক্ত আন্দোলন’ গড়ে তোলার বিষয়ে বিএনপির বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা জানান, গত ২৮ অক্টোবর ঢাকায় মহাসমাবেশ পণ্ড করে দেওয়ার পর সারাদেশে নেতাকর্মীকে গণহারে গ্রেপ্তার, সাঁড়াশি অভিযান আর হামলার মুখে বেশ কিছুটা চাপে পড়েছিল দল। তবে সেখান থেকে বেরিয়ে আসা হয়েছে। যার প্রমাণ গত ১০ ডিসেম্বর ‘আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচি এবং ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের শোভাযাত্রা। গণগ্রেপ্তার আতঙ্কের মধ্যেই কর্মসূচি দুটিতে যেমন ঘর থেকে বেরিয়ে আসে হাজারো কর্মী-সমর্থক, তেমনি নেমেছিল বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের ঢল। স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ওই কর্মসূচি মনস্তাত্ত্বিক টনিক হিসেবে কাজ করেছে। এখন আর তাদের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক কাজ করছে না বলে দাবি ওইসব নেতার।

তারা বলেন, এখন জীবন-মরণ খেলা শুরু হবে। বাঁচা-মরার ওই লড়াইয়ে তাদের প্রত্যেক নেতাকর্মী সাহসের সঙ্গে রাজপথে থাকবেন। তাদের হারানোর যেমন কিছু নেই, তেমনি এবার যদি পরিবর্তন না আসে তাহলে তাদের আর অস্তিত্বও থাকবে না। প্রত্যেকের মামলা শেষ পর্যায়ে। হয় কারাজীবন, নয়তো ফেরারি জীবন। কেউ বাঁচতে পারবে না। এমন একটা পরিস্থিতিতে দলের প্রত্যেক নেতাকর্মী মাঠে নামতে প্রস্তুত আছেন বলে জানান তারা।

রুহুল কবির রিজভী বলেন, গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারে বিশ্বাসী দেশের সরকারবিরোধী সব রাজনৈতিক দল যুগপৎ ধারায় রাজপথে নেমেছে। সরকার যতই নির্যাতন-নিপীড়ন করুক বিজয় না হওয়া পর্যন্ত এ আন্দোলন চলবে। আর নির্যাতন করে কখনোই আন্দোলন দমানো যায় না। এ সরকারও পারবে না। নেতাকর্মীরা আরও ঐক্যবদ্ধ, আরও সংকল্পবদ্ধ। এ জন্য তাদের আন্দোলন সফল হবেই।

রাজপথের আন্দোলনের বিষয়ে বিএনপি ও জোটের নেতারা বলেন, খুব শিগগির আন্দোলনের নতুন ফরমেট ঘোষণা করা হবে। সেখানে একেক দলকে একেক স্থানে সমবেত হওয়ার নির্দেশনা থাকতে পারে। কিংবা সব দলকে নিয়ে একসঙ্গে মাঠে নামার কৌশলও নেওয়া হতে পারে। দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী এসব দলের নেতাকর্মীর সঙ্গে সাধারণ মানুষকেও মাঠে নামানোর সিদ্ধান্ত রয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে সরকারের সীমাহীন নির্যাতনের কারণে ওষ্ঠাগত জনগণকে মাঠে নামাতে পারলে এই সরকার একদিনও ক্ষমতায় থাকতে পারবে না বলে তাদের বিশ্বাস। সেই হিসাব কষেই পরবর্তী হরতাল-অবরোধের কর্মসূচির পাশাপাশি আসতে পারে ঘেরাও, সমাবেশের মতো কর্মসূচি।

জানা গেছে, এই আন্দোলন সফল করতে রাজপথে থাকা সব রাজনৈতিক দলকে এক ছাতার মধ্যে আনতে কাজ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও আন্দোলনরত দলগুলোর সঙ্গে কথা বলছেন। শুরুতে বাম ঘরানার কয়েকটি রাজনৈতিক দল জামায়াতকে নিয়ে আপত্তি তুললেও এখন আর সেটি নেই। দেশের প্রয়োজনে তাদের বেশির ভাগ দল ছাড় দিয়ে আন্দোলনের মাঠে একাট্টা হতে প্রস্তুত রয়েছে সূত্র জানিয়েছে।

জানতে চাইলে এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, বিএনপির সঙ্গে আলোচনা করে যদি জামায়াতে ইসলামী এক মঞ্চে আসে, তাদের স্বাগত জানাব। দ্বিধাবিভক্ত শক্তি হলে আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্ররা উপকৃত হবে। বরং এক মঞ্চে এলে সরকার পতন অবশ্যম্ভাবী হবে।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির সহসভাপতি তানিয়া রব বলেন, এখন দেশের অস্তিত্বের বিষয় সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। সেখানে দেশের মানুষের অধিকার থাকবে কি থাকবে না, রাজনীতি থাকবে কি থাকবে না– সেটা নির্ভর করবে। এ অবস্থায় তাদের চলমান আন্দোলনের চূড়ান্ত মুহূর্তে যে কোনো কৌশল আসতে পারে বলে তিনি মনে করছেন।

সমকাল