অস্ত্র হাতে পুলিশের সাথে এরা কারা?

Daily Nayadiganta


ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শেখ হাসিনা সরকারের আমন্ত্রণে বাংলাদেশে আগমনের প্রতিবাদে হেফাজত ইসলামসহ ইসলামিক দলগুলো প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে, তবে হেফাজতের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। মোদি বাংলাদেশে আসার প্রতিবাদের কারণ হিসেবে প্রতিবাদকারীরা ঘোষণা করেছে যে, ১. মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাবস্থায় অনেক মুসলমানকে হত্যা করেছে, যার জন্য তিনি গুজরাটের কসাই হিসেবেও পরিচিত ২. মোদি সরকার বিভিন্ন বিধিবিধান করার মাধ্যমে ভারত থেকে মুসলমানদের বিতাড়িত করার উদ্যোগ নিয়েছে। একই সময় সেখানে সংখ্যালঘুদের ওপর নানা ছুতায় চলছে নানা অত্যাচার নির্যাতন। এসবের প্রতিবাদ করায় অনেককে প্রাণ দিতে হয়েছে ৩. কুরআনের ২৬টি আয়াত সংশোধন করার জন্য ভারতের হাইকোর্টে রিট করার মতো আস্কারা দেয়া হচ্ছে। সর্বোপরি সরকারি উসকানিতে ভারতে মুসলমানরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। মোদি এবং মোদির দল একটি সাম্প্রদায়িক শক্তি হিসেবে চিহ্নিত। মুক্তিযুদ্ধে তৎকালীন ভারত সরকার ও গান্ধী পরিবারের যে সহযোগিতা ছিল, অনুরূপ ভূমিকা বিজেপিপন্থীদের ছিল না। বাংলাদেশের জনগণ গান্ধী পরিবারের বিশেষ করে ইন্দিরা গান্ধীর সে সময়ের ভূমিকাকে স্মরণ করে। কোনো দেশের রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান যদি বাংলাদেশে আগমন করে তবে তা গৌরবের বিষয় বটে, কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ আছে তাদের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের আপামর জনগণ সাদর সম্ভাষণ জানাবে কোন কারণে?

ফ্রান্সে হজরত মুহাম্মদ সা:-এর প্রতি কটাক্ষ করায় গোটা বিশ্ব প্রতিবাদ করেছে, ফলে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট দুঃখ প্রকাশ করেছেন। হেফাজত ইসলামসহ ইসলামী দলগুলো এবং ধর্মপ্রাণ মুসলমান মাত্রই মোদির ঢাকায় আগমনের প্রতিবাদ করেছে, যারা ক্ষমতাসীনদের রক্তচক্ষুর ভয়ে বা সরকারি চাকরি হারানোর ভয়ে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে পারেনি তারাও ঘৃণা পোষণ করেছে, তবে মুসলমান নামধারী যারা নাস্তিক তাদের কথা আলাদা।

মোদিবিরোধী অবস্থানের কারণে মুসল্লি পুলিশ সংঘর্ষে দেশের বিভিন্ন স্থানে ১৯ জন হত্যা হয়েছে বলে হেফাজত ইসলাম দাবি করেছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশ ‘ঢাকায় বায়তুল মোকাররমের মুসল্লিদের সাথে পুলিশও যুবলীগ-ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ত্রিমুখী সংঘর্ষে শতাধিক মানুষ আহত হয়েছে। এর মধ্যে ৬০ জনকে ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি করা হয়েছে, আটক করা হয়েছে শতাধিক মুসল্লিকে।’ এ মর্মে পুলিশের সাথে অস্ত্র উঁচিয়ে সাদা পোশাকে একটি সশস্ত্রবাহিনীর আক্রমণের একটি সচিত্র প্রতিবেদন জাতীয় দৈনিকে ২৭ মার্চ প্রকাশিত হয়েছে। পত্রিকার সচিত্র ভাষ্য মতে, পুলিশের সাথের অস্ত্রধারীরা আওয়ামী ছাত্রলীগ-যুবলীগ। হেফাজতকে মোকাবেলার জন্য রাষ্ট্র বা সরকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সরকারি দলের ক্যাডারদের লেলিয়ে দেয়া একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কতটুকু যৌক্তিক? অন্য দিকে মোদির আগমনের বিরোধিতা করে প্রতিবাদকারীদের প্রতিবাদ কর্মসূচি করার সশস্ত্র বাধা প্রদান না করলে সরকার কতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হতো? ১৯ জনের জীবনের বিনিময়ে বাংলাদেশে মোদির আগমনে শেখ হাসিনা সরকারের কতটুকু লাভক্ষতি হয়েছে, তা ‘সময়ই’ বলে দেবে।

মোদিকে বারবার আমন্ত্রণ করে বাংলাদেশ সফরে এনে লাভবান হচ্ছে কি বাংলাদেশ রাষ্ট্র, নাকি এটা শেখ হাসিনা সরকারের একটি রাজনৈতিক ফয়দা? নাকি মোদিরও রাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে? তিস্তার পানি বাংলাদেশের জন্য একটি বার্নিং ইস্যু। ইতঃপূর্বেও শেখ হাসিনা সরকারের আমন্ত্রণে মোদি বাংলাদেশ সফর করেছেন। তখনো প্রত্যাশা করা হয়েছিল যে, মোদি সরকারের সময়কালের মধ্যেই তিস্তা চুক্তি সম্পন্ন হবে। মোদি পুনরায় নির্বাচিত হলেও চুক্তি স্বাক্ষর হয়নি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নিজেও কয়েক দফা ভারত সফরে গেছেন, প্রতিবারই তিস্তার পানি ছাড়াই তিনি ফেরত এসেছেন। এবারো সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মোদি বলেছেন, ‘তিস্তার পানি দেয়ার জন্য আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ।’ কিন্তু কবে কখন তিস্তার পানি বাংলাদেশ পাবে, এ সম্পর্কে মোদি কোনো প্রতিশ্রুতি দেননি।

অন্য দিকে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি প্রকাশ্যে বলে দিয়েছেন, ‘তিস্তার পানি দেয়া সম্ভব নয়।’ অথচ এ দোটানার মধ্যেই ভারতের স্বার্থ জড়িত চুক্তিগুলো সম্পাদিত হলেও বাংলাদেশের স্বার্থসংবলিত কোনো চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে কি না তা আদৌ জনগণ জানে না। অন্য দিকে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি দাবি করেছেন যে, মোদি তার দলীয় রাজনীতির ফয়দা হাসিলের জন্য বাংলাদেশে গেছেন। মমতার মতে, বাংলাদেশে গোপালগঞ্জে বসবাসকারী মতুয়া সম্প্রদায়ের একটি বিরাট অংশ ভারতের নাগরিক তাই ভারতীয় মতুয়াদের সমর্থন লাভের জন্য মোদির বাংলাদেশে আগমন। এ জন্য মোদির ভিসা বাতিলের দাবি জানিয়েছেন মমতা। বাংলাদেশে আগমনে মোদি কতটুকু লাভবান তা আলোচনার মুখ্য বিষয় নয়, মুখ্য বিষয়টি হচ্ছে এ সফরে বাংলাদেশের আপামর জনগণ কতটুকু সন্তুষ্ট?

পত্রিকান্তরে প্রকাশ বিভিন্ন জেলায় গাড়ি পোড়ানোসহ সহিংসতার জন্য অনেক মামলা হয়েছে। ঢাকার পার্শ্ববর্তী সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় ছয়টি মামলা হয়েছে, যার মধ্যে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংখ্যাই বেশি। এর মধ্যে ৫-৬ বছর আগে নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে মৃত্যুবরণকারী সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির আহ্বায়ক আলী হোসেনের নামও আসামি হিসেবে রয়েছে। অন্যান্য জেলায়ও অনুরূপভাবে বিএনপির নেতাকর্মীরাই আসামি। এতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, বিএনপিকে মাঠ ছাড়া করার উদ্দেশ্যেই এ ধরনের মামলা, যা সরকারের সাজানো নাটকও বলা হচ্ছে। ২৭ মার্চ জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী পুলিশের সাথে যেসব অস্ত্রধারী রয়েছে পত্রিকার ভাষ্য মতে, তারা আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগ-যুবলীগ। অথচ মামলা করা হচ্ছে নিরাপরাধ মানুষকে।

বিরোধী মতাবলম্বীদের কণ্ঠরোধ করার জন্য যে স্টিমরোলার সরকার চালাচ্ছে তার হাতিয়ার হিসেবে নগ্নভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে পুলিশ, প্রশাসন, আইন ও আদালত। পুলিশ, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখন জনগণের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, যার ফয়দা পুলিশও নিচ্ছে। সরকার অনৈতিকভাবে পুলিশকে ব্যবহার করছে বিধায় পুলিশের একটি অংশ নিজেরাও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে। পত্রিকা খুললেই দেখা যায় মাদক, চাঁদাবাজি ও অপহরণমূলক অভিযোগে পুলিশ সদস্য গ্রেফতার হচ্ছে। অথচ তাদের প্রমোশন হচ্ছে। আবার এদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে পুলিশ সরকারবিরোধীদের নির্মূল করার জন্য মিথ্যা মামলা সৃজন, গ্রেফতার, রিমান্ড ও চার্জশিট দেয়ার কাজ করিয়ে নিচ্ছে। এখন কলঙ্কজনক এক অধ্যায় রচিত হচ্ছে।

পুলিশ বাহিনীর বড় বড় কর্মকর্তারা পুলিশের পেশাদারিত্ব ও পেশার মান বৃদ্ধি করার জন্য প্রায়ই বাহিনীর নিম্নস্থ সদস্যদের নির্দেশাবলি জারি করাসহ বক্তৃতা করে থাকেন, যা ফলাও করে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। পুলিশের পেশাগত দায়িত্ব হচ্ছে অবৈধ অস্ত্রধারী ও অস্ত্র ব্যবহারকারীদের গ্রেফতার করা, কিন্তু হেফাজতের ঘটনায় ঘটেছে বিপরীত ঘটনা। সরকার বিরোধীদের ঠেঙ্গানোর জন্য পুলিশ অব্যাহত এ ধরনের ভূমিকাই গ্রহণ করে থাকে। কার্যত পুলিশ এখন আইনের ঊর্ধ্বে। ২০১৩ সালে পুলিশ কাস্টডিতে নির্যাতন বন্ধ করার জন্য আইন পাস হয়েছে, কিন্তু সে আইন সম্পূর্ণভাবে এখন অকার্যকর। পুলিশকে জনগণের জানমাল রক্ষার জন্য পেশাদার দায়িত্ব পালন করার দাবি করে সরকার। আমাদের প্রশ্ন বাইতুল মোকাররমে অস্ত্র হাতে পুলিশের সাথে এরা কারা?