অক্টোবরে আইএমএফের সঙ্গে ঋণ আলোচনা শেষ হওয়ার আগে নতুন পে স্কেলের ঘোষণা আসছে না

টিবিএস রিপোর্ট
28 July, 2026, 08:45 am
Last modified: 28 July, 2026, 08:49 am

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আগামী অক্টোবরে আলোচনা শেষ হওয়ার পর সরকারি চাকরিজীবীদের নবম জাতীয় পে স্কেল ঘোষণা করতে পারে সরকার। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ সিদ্ধান্ত অনেকটাই নির্ভর করবে ঋণদাতা সংস্থাটির সম্মতির ওপর।

রাজস্ব ঘাটতি ও দুর্বল রাজস্ব আহরণের কথা উল্লেখ করে আইএমএফ ইতোমধ্যে সরকারকে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন অন্তত দুই বছর পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। এ সুপারিশের পর সরকারও বিষয়টি নিয়ে আরও সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।

২৬ জুলাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে রাজস্ব আদায়, সরকারি ব্যয়, প্রস্তাবিত পে স্কেলের আর্থিক প্রভাব এবং সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন।

বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টি তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী কর্মকর্তাদের এ প্রস্তাব আরও বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনার নির্দেশ দেন। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ঝুঁকি, দেশের গ্যাস সরবরাহের ওপর চাপ এবং বৃহত্তর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে বলা হয়।

ইনফোগ্রাফিক: টিবিএস

কর্মকর্তারা জানান, আগামী ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর ব্যাংককে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সভার ফাঁকে আইএমএফের সঙ্গে সরকারের চূড়ান্ত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

কর্মকর্তাদের মতে, অনুন্নয়ন খাতের স্থায়ী ব্যয়, বিশেষ করে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়ে আইএমএফ যে অবস্থান নেবে, সেটিই পে স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ১২ থেকে ১৬ জুলাই বাংলাদেশ সফরকারী আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদল অর্থ বিভাগের সঙ্গে বেতন ও ভাতা বাজেটিং নিয়ে আলোচনা করে। সেখানে আইএমএফের প্রতিনিধিরা জানান, বর্তমান রাজস্ব ভিত্তি সরকারি চাকরিজীবীদের বেতনে বড় ধরনের বৃদ্ধি বহন করার মতো শক্তিশালী নয়।

ঋণদাতা সংস্থাটি আরও উল্লেখ করেছে, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং ভর্তুকিসহ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সরকারের ব্যয় দ্রুত বাড়ছে, কিন্তু রাজস্ব প্রবৃদ্ধি সে তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। ধারাবাহিক মূল্যস্ফীতি ও সীমিত আর্থিক সক্ষমতার কারণে এ মুহূর্তে নতুন পে স্কেল চালু করলে অতিরিক্ত আর্থিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আইএমএফ মনে করে।

তবে কর্মকর্তারা বলেছেন, সরকার এ প্রস্তাব থেকে সরে আসেনি।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে গঠিত ১০ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের কমিটি জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫, বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পে কমিশন-২০২৫ এবং সশস্ত্র বাহিনী বেতন কমিটি-২০২৫-এর সুপারিশ পর্যালোচনা করে নবম পে স্কেলের একটি সংশোধিত কাঠামো প্রস্তুত করেছে।

কিছু সংশোধনসহ প্রস্তাবটি অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রীর কাছেও উপস্থাপন করা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, আর্থিক চাপ কমাতে সরকার এখন ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন অথবা বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে ভাবছে। আগামী অক্টোবরে আইএমএফের বৈঠকের আগেই এ কৌশল চূড়ান্ত করা হতে পারে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ শুরু হয়। সে সময় সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ গঠন করা হয়। চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে বেতন ও ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়।

কমিশন সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেয়। একই সঙ্গে বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশে উন্নীত করা, ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের যাতায়াত ভাতা সংশোধন এবং অন্যান্য ভাতা পুনর্বিন্যাসের সুপারিশ করা হয়।

কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে বছরে অতিরিক্ত ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।

অর্থমন্ত্রী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেন। এ জন্য সংশোধিত বাজেটের তুলনায় জনপ্রশাসন খাতে অতিরিক্ত ৫৪ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

কর্মকর্তাদের মতে, অতিরিক্ত এ বরাদ্দের মধ্যে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা সরকারি চাকরিজীবী, এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও পেনশনভোগীদের সম্ভাব্য নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নতুন পে স্কেল অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল। তাদের মতে, ২০১৫ সালের পর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন পুনর্নির্ধারণ হয়নি। এ সময়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

তবে তারা একই সঙ্গে সতর্ক করে বলেছেন, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো কম এবং রাজস্ব আহরণও প্রয়োজনীয় মাত্রায় উন্নত হয়নি।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, রাজস্ব আহরণ শক্তিশালী না করে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন করলে সরকারকে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে হতে পারে। এতে বাজেট ঘাটতি বাড়বে এবং অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে।

Source: https://www.tbsnews.net/bangla/Economy/news-details-519696

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here