ট্রেনে পাথর ছোড়া

– ফাইল ছবি

১৮৫৩ সালে উপমহাদেশে রেল যোগাযোগের গোড়াপত্তন। শুরু থেকেই রেলপথে যাতায়াত অন্য সব পথের চেয়ে তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী, আরামদায়ক ও নিরাপদ হওয়ায় এখনো দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ ট্রেনে ভ্রমণ করে থাকেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ট্রেন ভ্রমণে যাত্রীদের সেই আস্থায় চির ধরেছে। প্রতিনিয়ত ট্রেনে পাথর ছোড়ার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় যাত্রীরা শঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। সংবাদমাধ্যমে ট্রেনে পাথর ছুড়ে মারা ঘটনার খবর প্রায়ই দেখা যায়। সম্প্রতি পাথর ছোড়ার সাথে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনাও বেড়েছে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জগামী কমিউটার ট্রেনে ডাকাতি হয়। ডাকাতরা যাত্রীদের কাছ থেকে অর্থসহ মূল্যবান জিনিসপত্র লুটে নেয়। এ অপকর্মে বাধা দেয়ার চেষ্টা করলে ডাকাতের ছুরিকাঘাতে নাহিদ ও সাগর নামে দুই যাত্রীর অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যু হয়। দেখা যাচ্ছে, বিগত কয়েক মাসে শতাধিক পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় ক্রমেই ট্রেনে যাতায়াত অনিরাপদ হয়ে উঠছে। খবরে প্রকাশ, রেললাইনের পাশে বসবাসকারী উঠতি বয়সের ছেলেরা খেলার ছলে পাথর ছুড়ে মারে। তাদের ছোড়া পাথরের আঘাতে যাত্রীরা আহত হচ্ছেন। এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। অথচ এই অপরাধের সাথে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও সামাজিক পদক্ষেপ বললেই চলে।

চলন্ত ট্রেনে যারা পাথর ছোড়ে তারা ভিন দেশী নাগরিক নয়। তারা আমাদেরই সমাজেরই বাসিন্দা। তাই পারিবারিক ও সামাজিকভাবে পাথর ছোড়ার বেদনাদায়ক পরিণতি কী হতে পারে তা তাদের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। এ অপকর্ম যারা করে থাকে তারা কখনো উপলব্ধি করে না, তাদের ছোড়া পাথরের আঘাতে নিরপরাধ মানুষের জীবন বিপন্ন হচ্ছে।
সাধারণত মানুষ প্রতিশোধের নেশায় মানুষ কাউকে হত্যা কিংবা জখম করে থাকে। কিন্তু যারা ট্রেনে পাথর ছুড়ে মারে; তাদের সাথে যাত্রীদের পূর্ব শত্রুতা কিংবা ব্যক্তিগত কোনো আক্রোশ নেই। যাত্রীর আহত হওয়ার ভেতর তাদের বিন্দুমাত্র স্বার্থ নেই। তাহলে কোন জিঘাংসায় তারা পাথর ছোড়ছে তা খতিয়ে দেখা জরুরি। কারণ তাদের ছোড়া পাথরের আঘাতে বহু পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।

রেলকে সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব করার লক্ষ্যে সরকার ২০১১ সালের ৪ ডিসেম্বর রেলপথ বিভাগকে একটি স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয়ে উন্নীত করে। কিন্তু তার পরও রেলের বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা, যাত্রী ভোগান্তি, দুর্ঘটনা কিংবা পাথর ছোড়ার ঘটনা থামেনি এবং কমেনি। উল্টো পাথর ছোড়ার ঘটনা বেড়েই চলেছে।

দেশে মোট প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার রেলপথের মধ্যে ৭০০ কিলোমিটারই অরক্ষিত। অথচ এ ব্যাপারে রেলকর্তৃপক্ষ উদাসীন। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ সারা দেশের ২০ জেলার ৭০টি স্থানকে পাথর ছোড়ার ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। দেশের রেলপথে পাথর ছোড়ার ঘটনা অব্যাহতভাবে বেড়েই চলেছে। এ ধরনের হামলায় ট্রেনের দরজা-জানালা ভাঙছে। ট্রেনের চালক, সহকারী চালক ও যাত্রীরা আহত হচ্ছেন। পাথর ছোড়ায় শুধু যাত্রীদেরই ক্ষতি হচ্ছে তা কিন্তু নয়, পাথর ছোড়ার ফলে রেলের প্রতি বছর কোটি কোটি টাকারও ক্ষতি হচ্ছে। সুতরাং এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মহলের দ্রুত উদ্যোগী ভ‚মিকা নেয়া অত্যাবশ্যক।

কোনো সভ্য দেশে ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের নজির না থাকলেও আমাদের দেশে পাথর ছোড়ার ঘটনা থামছে না। যাত্রীরা এখন জানালার পাশে বসতেও ভয় পান। জানালা বন্ধ রেখেও রেহাই পাচ্ছেন না। পাথরের টুকরো চোখে মুখে কপালে লাগছে। রেল মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যমতে, গত জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলন্ত ট্রেনে ১১০টির মতো পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। এতে ট্রেনের জানালার অন্তত ১০৩টি কাচ ভেঙেছে এবং আহত হয়েছেন ২৯ জন যাত্রী। গত পাঁচ বছরে দুই হাজারের চেয়ে বেশি পাথর ছোড়ার ঘটনা ঘটেছে।

গত ১৫ আগস্ট চলন্ত ট্রেনে পাথর ছোড়ার আঘাতে পাঁচ বছর বয়সী শিশু আজমির চোখে লাগে। এতে শিশুর একটি চোখ নষ্ট হয়ে যায়। নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলায় একটি চলন্ত ট্রেনে এ ঘটনা ঘটে। ২০১৮ সালের ৩০ এপ্রিল খুলনা বেনাপোল কমিউটার ট্রেনের পরিদর্শক বায়েজিদ হোসেন ছোড়া পাথরের আঘাতে ৪১ দিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। ২০১৩ সালে চট্টগামে ভাটিয়ারী এলাকায় চলন্ত ট্রেনে ছোড়া পাথরের আঘাতে প্রীতি দাশ নামে এক প্রকৌশলী নিহত হন।
রেললাইনের ওপর ১৪৪ ধারার বিধান কার্যকর আছে। অথচ রেললাইনের পাশে বাজার কিংবা বস্তি সরেনি। মাঝে মধ্যে উচ্ছেদের নামে ইঁদুর-বিড়াল খেলা হয়। কিন্তু ওই পর্যন্তই। ফলে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। আইনের বিধান থাকা সত্তে¡ও পাথর ছোড়া বন্ধ না হওয়া দুঃখজনক। বাংলাদেশ রেল আইনের ১২৭ ধারা অনুসারে পাথর নিক্ষেপের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। কোনো যাত্রী মারা গেলে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৩০২ ধারানুসারে ফাঁসির বিধান রয়েছে। অপরাধী অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে সে ক্ষেত্রে তার অভিভাবককে শাস্তি ভোগ করতে হবে। এমন কঠোর আইন থাকার পরও পাথর ছোড়া বন্ধ হচ্ছে না। কারণ রেল আইনে শাস্তির নজির খুবই কম। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আইনগত কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। ফলে এ প্রবণতা কমছে না। স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও নিরাপদ ট্রেন যাতায়াত নিশ্চিত করা যায়নি। এ ধরনের নিষ্ঠুর কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে সমাজ ও পরিবারকে এগিয়ে আসতে হবে। সামাজিকভাবে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। স্কুল-কলেজ, মাদরাসা, মসজিদের ইমাম ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সচেতনতামূলক কর্মসূচিতে এ বিষয়ে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। এভাবে চলতে থাকলে মানুষ ট্রেনে যাতায়াতের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলবেন। তাই এ ধরনের অপরাধ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here