ইসলাম কি ফ্যাসিবাদ ঘরানার বাইরে

Daily Nayadiganta

ইসলাম কি ফ্যাসিবাদ ঘরানার বাইরে – ছবি : সংগৃহীত

প্রোফাইল লকড রাখা একজন ফেসবুকার আমাকে লিখেছেন, ‘আমারে একটা কথার উত্তর দেন তো, ইসলাম কি ফ্যাসিবাদ ঘরানার বাইরে?’

এই রকম সওয়াল আরো অনেকের থাকতে পারে, তাই সংক্ষেপে উত্তর দিচ্ছি। আমার বিভিন্ন লেখায় এই চিন্তারই প্রতিধ্বনি পাবেন। আপনি বুর্জোয়া, বাম, বাকশালী, সমাজতন্ত্রী ফ্যাসিস্ট, কিংবা ইসলামপন্থী যা-ই হন, আশা করব আমাকে এ ধরনের অল্প কথাতে বুঝে নেবেন।

বাকিটা বোঝার জন্য মাঠের লড়াইয়ের ওপর নজর রাখুন।

ইসলাম অবশ্যই ফ্যাসিবাদী ঘরানার বাইরের তত্ত্ব, রাজনীতি বা রুহানি প্রকল্প। এটা বোঝার জন্য কাণ্ডজ্ঞান এবং ইতিহাসের দিন তারিখ বিবেচনাই যথেষ্ট। ফ্যাসিবাদ এসেছে আধুনিক পাশ্চাত্যে বেনিতো মুসোলিনী (২৯ জুলাই ১৮৮৩-২৮ এপ্রিল ১৯৪৫) এবং এডলফ হিটলারের (২৯ এপ্রিল ১৮৮৯ -৩০ এপ্রিল ১৯৪৫) হাত ধরে। এটা ইউরোপে পুঁজিবাদ, আধুনিকতা এবং জাতিবাদী যুদ্ধ বিগ্রহের কাল। আধুনিক পরিচয়বাদ ও জাতিবাদই ফ্যাসিবাদের ভিত্তি।

ইসলাম এসেছে ফ্যাসিবাদ আসারও চৌদ্দশ’ বছর আগে। মোহাম্মদ সা: ইসলামের শেষনবী (৫৭০- জুন ৬৩২), একমাত্র নবী নন। আল্লাহ শুধু আরবদের মধ্যে পথ প্রদর্শক পাঠাননি, সব জাতির মধ্যেই পথ প্রদর্শক পাঠিয়েছেন। তার মানে ইসলাম যেমন মানবেতিহাসের শুরু থেকেই আছে, তেমনি সব জনগোষ্ঠীর মধ্যেই কমবেশি হাজির আছে। পরিচয়বাদ কিংবা ফ্যাসিবাদের খপ্পরে না পড়ে ইসলামকে তার বিশেষ বৈশিষ্ট্য বা তাৎপর্যসহ চিনে নেওয়াটাই একালে আসল কাজ।

কিভাবে চিনব? মোহাম্মদ সা: আরবে এসে সব প্রকার রক্তবাদ, বংশবাদ, গোত্রবাদ, ভূখণ্ডবাদ, জাতিবাদ ইত্যাদি উৎখাত করে মক্কা বিজয়ের মধ্য দিয়ে কোরাইশদের দর্প, অহঙ্কার এবং বাপদাদার ধর্মের নামে আভিজাত্য টিকিয়ে রাখার সাধ ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছিলেন। তাহলে মক্কা বিজয়ের তাৎপর্য বিচার ইসলাম চিনবার প্রথম পাঠ। মক্কা বিজয় ছিল মানবজাতির ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা যার তাৎপর্য আধুনিককালের ফরাসি বিপ্লব, কিংবা মার্কিন স্বাধীনতার সংগ্রাম ও স্বাধীনতার ঘোষণার চেয়েও সুদূরপ্রসারী। যার আওয়াজ আজ ২০২১ সালেও কানে এসে নতুন রাজনৈতিক সংকল্পের আহ্বান জানায়।

মনে রাখবেন, মক্কা বিজয় যদি না হোত, তা হলে দুনিয়ায় ইসলাম বলে কিছু থাকত না।

ইসলাম আরবে ছিল একজন এতিমের নেতৃত্বে মক্কার কালোমানুষ, দাস আর এতিমদের বিপ্লব। যে বিপ্লব লালন পালন করেছে উম্মে আইমান বারাকা, খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদের মতো মহীয়সী নারী। যারা ঘোষণা দিয়েছিলেন, দুনিয়ায় আল্লাহ ছাড়া মানুষের কেউ নেই। আল্লাহ ছাড়া মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক রচনার কোনো ভিত্তি নেই। ভিত্তি থাকতে পারে না। সমাজের ভিত্তি হতে হবে এই আন্তরিক উপলব্ধি কিংবা এক কথায় ‘রুহানিয়াত’।

মানুষ জীবজন্তু না, মানুষ ইহলৌকিক বন্ধন অতিক্রম করে মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক স্থাপনের উচ্চতম রুহানি উপলব্ধির চর্চা করতে সক্ষম, সেই জন্য ইসলাম মানুষকে ইহলোকে আল্লাহর ‘খলিফা’ বা প্রতিনিধি বলে দাবি করে। তাই কোনো ইহলৌকিক দাসত্বের বন্ধন নয়, মানুষের মধ্যে রুহানিয়াতের বিকাশ এবং তার আমলই নতুন বিশ্বসমাজ গড়বার পথ।

সব মানুষ সমান, মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নাই- এটাই ইসলামের সারকথা। সবাই এক জোড়া নারী এবং পুরুষের সন্তান কিংবা আদি বাবা আদম এবং আদি জননী বিবি হাওয়ার ধারাবাহিকতা- এই ঘোষণা দিয়েই ইসলাম এসেছে। তাই ইসলাম দাবি করে দুনিয়ায় কোনো জাতপাত, ধনী-গরিব এবং আরব/অনারব ভেদ থাকতে পারবে না। যদি থাকে তাকে উৎখাত করতে হবে। যে কারণে মানুষের সাথে মানুষের ঐক্য কায়েমের অর্থাৎ বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার আদর্শ নিয়ে- সব প্রকার রক্তবাদ, জাতিবাদ ও ফ্যাসিবাদ ধ্বংস করে একটি ‘বিশ্বসমাজ’ বা ইসলামের পরিভাষায় ‘উম্মাহ’ কায়েমের স্বপ্ন ইসলাম জারি রাখে।

ইহলৌকিক লড়াই বাদ দিয়ে ইসলামকে শুধু পারলৌকিক কারবারে পর্যবসিত করা ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। যদি ইসলাম সেটাই হতো, তাহলে আল্লাহর নবী হেরা গুহাতেই এবাদত করে জীবন কাটিয়ে দিতে পারতেন। তাঁর জীবনের পুরোটাই ছিল রাজনৈতিক লড়াই-সংগ্রামের জীবন। তিনি শুধু ধর্মগুরু নন। তিনি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সেনাপতি। বিপ্লবী লড়াই-সংগ্রামের সামরিক নীতির দিকনির্দেশকও তিনি।

আল্লাহ আমাদের শুধু নবী এবং কুরআনুল করিম দেননি। সবার আগে তিনি দুনিয়া সৃষ্টি করেছেন, আমাদের জন্মের আগে থেকেই যা আছে, তিনি তাঁর সৃষ্ট দুনিয়াতেই আমাদের সৃষ্টি করে পাঠিয়েছেন। আমরা আগে জন্মগ্রহণ করি, তারপর কুরআনুল করিম হাতে পাই। ধর্মকথা ও ধর্মের ইতিহাস আমরা পরে শুনি। কিন্তু বোঝাবুঝির দায় যার যার নিজের। ইসলামে ক্যাথলিক খ্রিষ্টিয়ানিটির মতো কোনো ভ্যাটিকান নেই, জন্মসূত্রে ব্রাহ্মণও নেই অর্থাৎ কোনো ধর্মীয় কর্তৃত্ব দাবির সুযোগ নেই। আপনার বিবেক-বুদ্ধি আছে, সেটা কাউকে বন্ধক দিয়ে তার দাসত্ব করা আপনার কাজ নয়। বরং আল্লাহর দেওয়া বিবেক, বুদ্ধি, পর্যালোচনা বা সত্য-মিথ্যা বিচারের ক্ষমতা অর্জনের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করাই আল্লাহকে পাবার পথ। এর মধ্য দিয়েই আমরা পরস্পরকে বুঝি, পরস্পরের সাথে একতা উপলব্ধি করি, ঐক্যবদ্ধ হই। বুঝি যে, আমার মধ্যে যিনি আছেন তিনি রক্তমাংসের অন্য বিবেকবান রুহানি মানুষের মধ্যেও বিরাজ করেন। তিনি ‘এক’- সবার মধ্যেই আছেন। কাজ হচ্ছে তাঁর সাথে নিরন্তর দায়েমি সালাতে যুক্ত থেকে তাঁকে উপলব্ধি করা।

অর্থাৎ আল্লাহ আমাদের রক্তমাংসের মানুষ হিসাবে, মস্তিষ্ক মগজসহ ‘আকল’ বা বিচারবুদ্ধি-পর্যালোচনার ক্ষমতাও দিয়েছেন, কিন্তু আমরা তার চর্চা করি না। সেটা দ্বীনের আমল গণ্য করি না। এই গোড়ার শরিয়াহ আমরা ভুলে গেছি। এ ক্ষেত্রে আমাদের চরম আলস্য। মানুষই কুরআন পড়ে এবং কুরআনের তাফসির বা ব্যাখ্যা করে। তাহলে ‘আকল’ কিংবা বিচারবুদ্ধি-পর্যালোচনার ক্ষমতার বিকাশের সাথে ইসলাম বলতে আমরা কী বুঝি সেই প্রশ্ন জড়িত। এটি এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।

বুদ্ধি, প্রজ্ঞা ইতিহাস জ্ঞান ইত্যাদির অভাবে ইসলাম যখন বুঝি না তখন ‘ইসলাম ফ্যাসিবাদ ঘরানার বাইরে কিনা?’ … এ ধরনের প্রশ্নও আমরা করি।

আল্লাহ সবাইকে হেদায়েত দান করুন। সবার কাছে দোয়ার দরখাস্ত পেশ করছি।
(লেখকের ফেসবুক পেজ থেকে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here