মক্কা চুক্তি যেভাবে মধ্যপ্রাচ্য নতুন বাস্তবতা হাজির করল

সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিরক্ষা চুক্তি দেখিয়ে দিয়েছে পুরোনো কাঠামো বদলাচ্ছে
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিরক্ষা চুক্তি দেখিয়ে দিয়েছে পুরোনো কাঠামো বদলাচ্ছেরয়টার্স

বহু বছর ধরে সৌদি আরবের কৌশলগত ধৈর্যকে অনেকেই ভুলভাবে নির্ভরশীলতা হিসেবে দেখেছে। রিয়াদ উসকানি সহ্য করেছে, অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে যায়নি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে এবং অভ্যন্তরীণ উন্নয়নে মনোযোগ দিয়েছে। তবে এই সংযম কখনোই এমন বিশ্বাস ছিল না যে যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর নিরাপত্তাব্যবস্থা স্থায়ী থাকবে।

মক্কায় সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি দেখিয়ে দিয়েছে যে পুরোনো কাঠামো বদলাচ্ছে। সুন্নি মুসলিম বিশ্বের তিনটি প্রভাবশালী দেশ এখন একসঙ্গে দাঁড়িয়েছে। এদের একটির ওপর হামলা মানে তিনটির ওপর হামলা হিসেবে ধরা হবে। এটি নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থার সূচনা।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ এই পরিবর্তনকে দ্রুত করেছে। ইরানের পাল্টা হামলা উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটির দুর্বলতা প্রকাশ করে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের সামরিক অবস্থান পুনর্বিন্যাস করতে হয়েছে। সময়ের সঙ্গে কিছু ঘাঁটি বন্ধ হবে, কারণ সেগুলোর গুরুত্ব কমেছে। আগের মতো বড় সামরিক উপস্থিতি ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি সরে যাচ্ছে না। তাদের গোয়েন্দা, সামরিক, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক প্রভাব থাকবে। কিন্তু যুদ্ধটি দেখিয়েছে, তাদের ক্ষমতার সীমা আছে। তাই এখন আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নিজেরাই গড়ে তুলছে।

নতুন জোটের সামরিক ভিত্তি শক্ত। পাকিস্তানের রয়েছে মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনী এবং একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্র। তুরস্কের রয়েছে দ্বিতীয় শক্তিশালী বাহিনী, ন্যাটো অভিজ্ঞতা, শক্তিশালী নৌবাহিনী ও উন্নত প্রতিরক্ষা শিল্প। দুই দেশেই বড় বিমানবাহিনী আছে, যদিও কিছু পুরোনো। সৌদি আরব এই জোটে আকাশ শক্তি যোগ করছে। তাদের বিমানবাহিনী মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী। আধুনিক যুদ্ধবিমান, উন্নত গোয়েন্দা, আকাশ প্রতিরক্ষা ও নির্ভুল হামলার সক্ষমতা তাদের রয়েছে।

পাকিস্তান ইতিমধ্যে সৌদি নিরাপত্তায় যুক্ত। পাকিস্তানি বাহিনী সৌদি বাহিনীর সঙ্গে কাজ করছে এবং তেহরানকে সতর্ক করেছে। তুরস্ক এখন এই সৌদি-পাকিস্তান সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। পরবর্তী ধাপে উপসাগরীয় দেশগুলোর যুক্ত হওয়া স্বাভাবিক।

অনেকে এই চুক্তিকে প্রতীকী ভাবতে পারে। কিন্তু বাস্তবে সহযোগিতা শুরু হয়েছে। সামুদ্রিক জোট আছে, ইয়েমেনে অভিযান চলছে, উপসাগরে সংহতির আলোচনা হচ্ছে। এই চুক্তি সেই প্রক্রিয়াকে আনুষ্ঠানিক করেছে। এটাই আমেরিকা-পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যের শুরু।

বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারে শক্তিশালী আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থার আলোচনা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ছাতা ছাড়া কোনো দেশ একা বড় শক্তির মোকাবিলা করতে পারবে না। তাই সৌদি আরবকে কেন্দ্র করে সংহতি গড়া জরুরি। বাইরে থাকা মানে কৌশলগত দুর্বলতা।

এই জোট সামুদ্রিক নিরাপত্তাতেও সক্রিয়। সৌদি নেতৃত্বে গঠিত জোট লোহিত সাগর, বাব আল–মানদেব, হরমুজ প্রণালি, আরব সাগর ও উপসাগরীয় উপকূল রক্ষা করবে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ভৌগোলিকভাবে সৌদি আরব এই ব্যবস্থার কেন্দ্র। তারা হরমুজ ও বাব আল–মানদেব—দুটির সঙ্গেই যুক্ত।

অর্থনীতিতেও তারা সবচেয়ে বড় শক্তি, বিশ্বের প্রধান তেল রপ্তানিকারক এবং ওপেকের নেতা। তাদের তেল উৎপাদন বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণে সৌদি আরব আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্র। ইরান তার প্রভাব বাড়াতে চায়, কিন্তু শক্তিশালী সৌদি আরব তা সীমিত করে। তাই সৌদি শক্তি কমানোই ছিল তেহরানের কৌশল।

সৌদি আরবকে তিন দিক থেকে চাপ দেওয়া হয়েছে—পূর্বে ইরান, উত্তর-পূর্বে ইরানপন্থী মিলিশিয়া এবং দক্ষিণে ইয়েমেনের হুতিরা। সরাসরি সংঘর্ষ কমলেও ইরাক ও ইয়েমেনে উত্তেজনা আছে। কিন্তু এই চাপের ফল হয়েছে উল্টো। সৌদিকে ঘিরে নতুন জোট তৈরি হয়েছে, যা ইরানের প্রভাব ঠেকাতে পারে। এই জোট শিয়াবিরোধী হওয়া উচিত নয়। ইরান একটি আঞ্চলিক শক্তি, তবে সশস্ত্র গোষ্ঠী ব্যবহার করে চাপ সৃষ্টি করা গ্রহণযোগ্য নয়। ইরান এই সীমা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। ইরাকে তাদের মিত্ররা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বে হুতিদের শক্তি কমানোর চেষ্টা চলছে।

এই জোটগুলোর সম্মিলিত শক্তি এখন ছয় লাখ ৫০ হাজারের বেশি। এটি একক বাহিনী নয়, বরং সমন্বিত আঞ্চলিক শক্তি। এই পরিবর্তন ইসরায়েলের জন্যও বার্তা। সামরিক শক্তি মানেই সীমাহীন ক্ষমতা নয়। কাতারে হামলা দেখিয়েছে এর পরিণতি কী হতে পারে। উপসাগরীয় দেশের ওপর আঘাত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। নতুন কাঠামো ইরান ও ইসরায়েল উভয়ের জন্য সীমা নির্ধারণ করবে। ফলে একটি ভারসাম্য তৈরি হবে।

অনেকে এই চুক্তিকে প্রতীকী ভাবতে পারে। কিন্তু বাস্তবে সহযোগিতা শুরু হয়েছে। সামুদ্রিক জোট আছে, ইয়েমেনে অভিযান চলছে, উপসাগরে সংহতির আলোচনা হচ্ছে। এই চুক্তি সেই প্রক্রিয়াকে আনুষ্ঠানিক করেছে। এটাই আমেরিকা-পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যের শুরু। এখানে যুক্তরাষ্ট্র থাকবে, কিন্তু একমাত্র নিরাপত্তানির্ভরতা থাকবে না। দেশগুলো নিজেরাই নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। এবং এই নতুন ব্যবস্থার কেন্দ্র হয়ে উঠছে সৌদি আরব।

  • নাওয়াফ ওবায়েদ লন্ডনের কিংস কলেজের যুদ্ধবিষয়ক বিভাগের জ্যেষ্ঠ গবেষক

    আল–জাজিরা থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত।

    Source: https://www.prothomalo.com/opinion/column/6n6b66ioli

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here