তারল্য বৃদ্ধি ও ঋণ চাহিদা হ্রাসে ব্যাংকগুলোর ধার নেওয়ার প্রবণতা তলানিতে

The Financial Express

প্রকাশ :

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থবির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়া এবং বৈদেশিক মুদ্রা স্থানীয় মুদ্রায় রূপান্তরের ফলে তারল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আন্তঃব্যাংক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার পরিমাণ ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে।ডলার-টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে তাদের হস্তক্ষেপ জোরদার করেছে, যার ফলে পরোক্ষভাবে ব্যাংকগুলোর ভল্টে স্থানীয় মুদ্রার তারল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।

প্রকৃতপক্ষে, বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম থাকায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের মার্কিন ডলার বিক্রির মাধ্যমে স্থানীয় মুদ্রার বাধ্যবাধকতা মেটানোর জন্য তারল্য ব্যবস্থাপনা করছে। এটি ব্যাংকগুলোকে তাদের চাহিদা ও জোগানের অমিল কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করছে, যার ফলে আন্তঃব্যাংক বাজার বা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা ও আগ্রহ কমেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আন্তঃব্যাংক স্বল্পমেয়াদী ধারের মাধ্যম ‘কল মানি’ লেনদেনের মাসিক পরিমাণ গত জানুয়ারিতে ৯৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে, যা গত বছরের সেপ্টেম্বর ও নভেম্বরে ছিল যথাক্রমে ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা ও ১ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘রেপো’ হলো আরেকটি প্রধান মাধ্যম যার মাধ্যমে ব্যাংকগুলো নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকে তহবিল ধার করতে পারে।

তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুলাই মাসে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সম্মিলিতভাবে ১ লাখ ৫৫ হাজার কোটি টাকা ধার করেছিল, কিন্তু সেই মাসিক ধারের পরিমাণ সেপ্টেম্বরে ৯৯ হাজার ৬০০ কোটি এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ৮২ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।

অন্যদিকে, এএলএস (অ্যাসিউর্ড লিকুইডিটি সাপোর্ট), এআর (অ্যাসিউর্ড রেপো) এবং আইবিএলএফ (ইসলামী ব্যাংকস লিকুইডিটি ফ্যাসিলিটি)-এর মতো সাতটি উইন্ডোর বিশেষ তারল্য সুবিধার আওতায় ব্যাংকগুলো জুলাই মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে মোট ১ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা ধার করেছিল। এই মাসিক ধারের পরিমাণ গত সেপ্টেম্বর ও নভেম্বরে যথাক্রমে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি ও ৩৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকায় এবং চলতি বছরের জানুয়ারিতে ২৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, টাকা-ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে গত বছরের ১৩ জুলাই থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে মার্কিন ডলার কেনা অব্যাহত রেখেছে। এই হস্তক্ষেপের আওতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ পর্যন্ত বাজার থেকে ৫.২৬ বিলিয়ন ডলার কিনেছে এবং ব্যাংকগুলোতে ৬৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি ইনজেক্ট (সরবরাহ) করেছে। তিনি ‘দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস’-কে বলেন, “বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণ নেওয়ার প্রবণতা হ্রাসের পেছনে এই হস্তক্ষেপ বড় ভূমিকা পালন করছে।”

এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ড. মো. তৌহিদুল আলম খান মনে করেন, বর্তমানে আন্তঃব্যাংক কল মানি রেট বাংলাদেশ ব্যাংকের রেপো রেটের নিচে অবস্থান করছে—এই পরিস্থিতির পেছনে প্রধান কারণ হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিরবচ্ছিন্ন বৈদেশিক মুদ্রার বাজার হস্তক্ষেপ। প্রতিটি ডলার কেনার বিপরীতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশি টাকা সরবরাহ করা হচ্ছে, যা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্থানীয় মুদ্রার তারল্য বাড়াচ্ছে।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, “এই অর্থ সরবরাহ সামগ্রিক মুদ্রা সরবরাহকে প্রসারিত করে এবং আর্থিক খাতে তারল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে। নগদ অর্থের উদ্বৃত্ত থাকায় ব্যাংকগুলোর স্বল্পমেয়াদী ধারের ওপর নির্ভরতা কমছে এবং আন্তঃব্যাংক অর্থায়নের চাপ প্রশমিত হচ্ছে।”

এর ফলে ব্যাংকগুলো একে অপরকে প্রতিযোগিতামূলক হারে ঋণ দিতে আগ্রহী হচ্ছে, যা কল মানি রেট কমিয়ে দিচ্ছে। এই পরিবেশে তুলনামূলক উচ্চ হারের রেপো সুবিধা ব্যবহারের চেয়ে অন্য ব্যাংক থেকে কম হারে ধার করা বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার ক্রয়ের পাশাপাশি শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ঐতিহাসিক সর্বনিম্ন ৬.১০ শতাংশে নেমে এসেছে। বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে টিকে থাকা উদ্যোক্তারা ১৫ শতাংশের মতো উচ্চ সুদহার বহন করতে পারছেন না।

“তাই বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের এখন ঋণের প্রতি আগ্রহ নেই। এটি আরেকটি বড় কারণ,” বলে মন্তব্য করেন এই অভিজ্ঞ ব্যাংকার।

তিনি সরকারকে পরামর্শ দেন যে মুদ্রাস্ফীতি, নীতি সুদহার এবং সুদের হার কমিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করা উচিত।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, রেকর্ড রেমিট্যান্স প্রবাহের মধ্যে বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে ‘নন-স্টেরিলাইজড’ হস্তক্ষেপ চালিয়ে যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, “এর ফলে ঋণের চাহিদা কম থাকা সত্ত্বেও বাজারে মুদ্রা সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে। ব্যাংকগুলোর ঋণ গ্রহণের প্রবণতা হ্রাসের এটাই প্রধান কারণ।”

তবে এই অর্থবাজার বিশেষজ্ঞ মনে করেন, বর্তমান অর্থবছরের শেষ প্রান্তিক থেকে, অর্থাৎ পরবর্তী সরকারের আমলে বেসরকারি খাতের ঋণের চাহিদা আবার বাড়তে পারে।

Source: https://bangla.thefinancialexpress.com.bd/trade/tarlz-brriddhi-oo-rrin-cahida-hrase-bzangkgulor-dhar-newar-prbnta-tlanite