- ২৪ ডেস্ক
জুলাই যোদ্ধা ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম দৈনিক প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার ও সংস্কৃতি কেন্দ্র ছায়ানটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ-এর সম্পাদক ও প্রবীণ সাংবাদিক নূরুল কবীরকে হেনস্তার ঘটনাও ঘটে। বৃহস্পতিবার (১৮ ডিসেম্বর) দিবাগত রাতে সংঘটিত এসব ঘটনার তীব্র নিন্দা, প্রতিবাদ ও গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি), বিএনপি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, জাতীয় প্রেস ক্লাবসহ বিভিন্ন সাংবাদিক ও সামাজিক সংগঠন।

বৃহস্পতিবার রাত ১২টার দিকে কতিপয় উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি প্রথমে দৈনিক প্রথম আলো এবং পরে দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। এ সময় পত্রিকা দুটির অনেক সাংবাদিক ভবনের ভেতরে আটকা পড়েন। খবর পেয়ে সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা আটকে পড়া সাংবাদিকদের উদ্ধার করেন। পত্রিকা দুটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রাতে আকস্মিক হামলা ও অগ্নিসংযোগের পর কর্মীদের নিরাপত্তার স্বার্থে অফিস ত্যাগের নির্দেশ দেওয়ায় শুক্রবার (১৯ ডিসেম্বর) তাদের ছাপা পত্রিকা প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।
এসব ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান শুক্রবার (১৯ ডিসেম্বর) এক বিবৃতিতে বলেন, কর্তৃত্ববাদী শাসনের পতনের পর বিজয়ী শক্তিগুলোর একাংশের আক্রোশপূর্ণ আচরণ রাষ্ট্র ও সমাজে নতুন দমনমূলক প্রবণতা তৈরি করছে। তিনি বলেন, টার্গেটেড শুটিংয়ে জড়িতদের গ্রেপ্তারে সরকারের ব্যর্থতা এবং উদ্ভূত অস্থিতিশীলতা মোকাবিলায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চরম অদূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে। টিআইবি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন তাদের পৃথক বিবৃতিতে ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে দিপু চন্দ্র দাস নামের এক শ্রমিককে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায়ও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির পক্ষ থেকে শুক্রবার রাতে গুলশানে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে একটি চিহ্নিত মহল দেশকে নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দিতে চায়। সরকারের নাকের ডগায় এসব তৎপরতা চললেও সরকারের ভূমিকা সন্তোষজনক নয়। তিনি এই হামলাকে আগামী জাতীয় নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক উত্তরণকে বাধাগ্রস্ত করার ষড়যন্ত্র হিসেবে অভিহিত করেন।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ ও সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভুঁইয়া এক বিবৃতিতে এই হামলাকে বাকস্বাধীনতার ওপর আঘাত এবং জুলাই বিপ্লবের চেতনার পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেন। তারা বলেন, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্বাধীন গণমাধ্যম অপরিহার্য। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)-এর সভাপতি আবু সালেহ আকন ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল বলেন, হাদির মৃত্যুকে পুঁজি করে যারা গণমাধ্যমে হামলা করেছে, তারা হাদির প্রকৃত অনুসারী হতে পারে না।
এছাড়া ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ), রিপোর্টার্স অ্যাগেইনস্ট করাপশন (র্যাক), বাংলাদেশ সেক্রেটারিয়েট রিপোর্টার্স ফোরাম (বিএসআরএফ) এবং বাংলাদেশ পার্লামেন্ট জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (বিপিজেএ)-এর নেতৃবৃন্দ পৃথক বিবৃতিতে জানান, সংবাদমাধ্যম রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। ভিন্নমত দমনে সহিংসতা বা ভয়ভীতি প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তারা নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবীরের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (ডুজা), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (রাবিসাস), এডুকেশন রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ইরাব) এবং কবি নজরুল সরকারি কলেজ সাংবাদিক সমিতি (কনকসাস) তাদের বিবৃতিতে উল্লেখ করে, সংবাদমাধ্যমে হামলা ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার পুনরাবৃত্তির ইঙ্গিত দেয়। বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (বাংলাদেশ ন্যাপ)-এর নেতারাও এই সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে বলেন, ওসমান হাদির শোককে ব্যবহার করে একটি গোষ্ঠী নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দপ্তর সম্পাদক শাহাদাত হোসেন স্বাক্ষরিত বার্তায় বলা হয়, হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে একটি উগ্র ও নিয়ন্ত্রণহীন রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপনের অপচেষ্টা চলছে। সংগঠনটি হামলাকারীদের ‘জুলাইবিরোধী শক্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও মিডিয়াসহ সব প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানায়।









