www.bbc.com/bengali/news
ছবির উৎস,AHARAR HOSSAIN
বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা অবশেষে দেড় বছর পর শ্রেণিকক্ষে ফিরলো। দিনের হিসেবে ৫৪৪ দিন পর।
দিনের শুরুতে ঢাকা ও ঢাকার বাইরের অনেক এলাকাতেই দেখা গেছে পথে পথে ছেলেমেয়েরা হেঁটে যাচ্ছে। কেউ অভিভাবকের সাথে। কেউ সহপাঠীদের সাথে দল বেঁধে। কেউবা একাকী। তাদের পরনে স্কুলপোশাক। পিঠে ব্যাগ।
ঢাকার মহাখালীতে বিএএফ শাহীন স্কুলের ফটক দিয়ে সকাল আটটার কিছু আগে দলে দলে শিক্ষার্থীরা প্রবেশ করছিল। এসময় অনেককেই জড়ো হয়ে গল্প করতে দেখা গেছে। তাদের চেহারায় ছিল খুশির ঝিলিক, অনেকদিন পর বন্ধু-সহপাঠীদের সাথে দেখা হবার আনন্দ।
ঢাকার বাইরে স্কুলের প্রথম দিনটি দেখতে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার কামরানীর চর নামে একটি গ্রামে গেছেন বিবিসির শাহনেওয়াজ রকি।
তিনি জানাচ্ছিলেন, তিনি যে স্কুলটির সামনে আছেন, সেটিতে নটার পর থেকে ক্লাস শুরু হবার কথা। কিন্তু ভোর সাতটা থেকেই স্কুলের অনেক ছাত্রছাত্রী এসে ঘুরে যাচ্ছিল, সত্যিই স্কুল খুলছে কী না সেটা দেখতে।
ছবির উৎস,SHAHNEWAZ ROCKY
টেলিভিশনে প্রচারিত সরাসরি সম্প্রচারকৃত ভিডিওতে দেখা যায়, অনেকটা উৎসবমুখর পরিবেশেই স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীরা প্রবেশ করছে।
স্কুলে প্রবেশের সময় মাস্ক আছে কিনা সেটি যাচাই, না থাকলে বিতরণ, হ্যান্ড স্যানিটাইজার দেয়া এবং শরীরের তাপমাত্রা মাপা হচ্ছে। এছাড়া শ্রেণীকক্ষের ভেতরেও সামাজিক দূরত্ব রেখে শিক্ষার্থীদের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
অনেক স্কুলেই শিক্ষার্থীদের ফুল এবং চকলেট দিয়ে স্বাগত জানাতে দেখা গেছে। স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী ভিড় এড়াতে অনেক স্কুলেই অভিভাবকদেরকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি।
চার কোটির বেশি শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ব্যহত
বাংলাদেশে সর্বশেষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা ছিল ২০২০ সালের ১৬ই মার্চ। তার পরদিন ১৭ই মার্চ ছিল জাতীয় ছুটি। সেদিন মুজিব জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে বছরব্যাপী আয়োজনের প্রধান অনুষ্ঠানমালাও হওয়ার কথা ছিল। এ উপলক্ষ্যে বাংলাদেশে আসার কথা ছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর।
কিন্তু এরই মধ্যে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়লে তার এই যাত্রা বাতিল করা হয় শেষ মুহূর্তে।
ছবির উৎস,AHARAR HOSSAIN
১৮ই এপ্রিল থেকে বাংলাদেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়। এমনকি পরবর্তীতে যে পাবলিক পরীক্ষাগুলো হওয়ার কথা ছিল সেগুলোও অনুষ্ঠিত হয়নি।
শিক্ষার্থীদের পূর্ববর্তী পরীক্ষাগুলোর ফলাফলের উপর ভিত্তি করে একটি ফলাফল প্রকাশ করা হয় যাকে ব্যাপকভাবে ‘অটোপাশ’ বলে অভিহিত করা হয়েছে পরবর্তী দিনগুলোতে।
এর পর গত দেড় বছরেরও বেশি সময়ে দফায় দফায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটি বাড়ানোর কারণে স্কুল বন্ধ থাকায় শ্রেণীকক্ষে কোন পাঠদান হয়নি।
জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের প্রকাশিত এক নিবন্ধ থেকে জানা যায়, গত মার্চ মাস পর্যন্ত টানা এক বছর পৃথিবীজুড়ে প্রায় সতের কোটি শিক্ষার্থী শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় দশ কোটি শিশুই ছিল ১৪টি দেশের, যেগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ একটি।
বিশ্বব্যাংকের এক হিসেব থেকে জানা যায়, ২০২০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল চার কোটির কিছু বেশি।
করোনাভাইরাস মহামারির কারণে শিক্ষা কার্যক্রম পৃথিবীজুড়েই ব্যহত হলেও টানা দেড় বছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার নজির খুব কম দেশেই আছে।
ছবির উৎস,RAIHAN MASUD
যে সব শর্তে স্কুল খুলেছে
গত ৩রা সেপ্টেম্বর শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি ১২ই সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশের সব স্কুল কলেজ খুলে দেয়ার ঘোষণা দেন।
এরই ধারাবাহিকতায় আজ থেকে মূলত প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক ও মাদ্রাসাসহ সব ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই খুলে দেয়া হচ্ছে। আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আগামী ১৫ই অক্টোবর থেকে খুলে দেয়ার কথা রয়েছে।
তবে, স্কুল খোলার ১৯ দফা শর্ত জুড়ে দেয় সরকার। এসব শর্ত ঠিক মতো পালিত হচ্ছে কিনা বা স্কুল খোলার পর করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি কেমন হয় তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে কর্তৃপক্ষ।
এসব শর্ত অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অবস্থানের সময় শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং কর্মকর্তা, কর্মচারী সবাইকে সবসময় মাস্ক পরতে হবে।
শিক্ষার্থীদের তিন ফুট শারীরিক দূরত্বে রাখা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিদিন নিয়মিত পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করার কথা আছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী শ্রেণি কক্ষে ৫ ফুটের চেয়ে ছোট আকারের বেঞ্চিতে একজন ও এর চেয়ে বড় আকারের বেঞ্চিতে দুজন শিক্ষার্থী বসানো যাবে।
কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম দিকে পাবলিক পরীক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরাই বেশি আসবে। বাকিদের স্কুলে আসার জন্য রোটেশন সিস্টেম অর্থাৎ আজ যারা আসবে তারা কাল আসবে না-এই নীতি অনুসরণের পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
স্কুলগুলোকে পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত করা ছাড়াও স্কুলে কোভিড সংক্রান্ত ব্যবস্থা অর্থাৎ হাত ধোয়া, তাপমাত্রা পরীক্ষা ও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করারও শর্ত রয়েছে।
এর আগে গত ২রা সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক ঘোষণা করেছিলেন যে, চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় এবং নার্সিং ইনস্টিটিউটগুলোয় আগামী ১৩ই সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষার্থীদের সশরীরে উপস্থিতির মাধ্যমে ক্লাস শুরু হবে।
তবে আজ থেকে স্কুল-কলেজ খোলা থাকার কথা থাকলেও প্রায় এক হাজারের মতো কিন্ডারগার্টেন ও স্কুল খুলবে না।
এসব স্কুলের শিক্ষকরা বলছেন, মূলত আর্থিক অস্বচ্ছলতা, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থী সংকটের কারণেই স্কুলগুলো বন্ধ রাখতে তারা বাধ্য হচ্ছেন।
এদিকে বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন স্কুল এবং কলেজ ঐক্য পরিষদ দাবি করছে যে, করোনাভাইরাস মহামারির কারণে নানা সংকটের মুখে ১০ হাজারের মত স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে।