Site icon The Bangladesh Chronicle

বোনের দাবি: মুনিয়াকে হত্যা করা হয়েছে


দোষী কাউকে ছাড় দেয়া হবে না : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
মুনিয়াকে হত্যা করা হয়েছে – ছবি : সংগৃহীত

গুলশানের অভিজাত ফ্ল্যাটে নিহত কলেজছাত্রী মোসারাত জাহান মুনিয়ার বড় বোন নুসরাত জাহান তানিয়া অভিযোগ করেছেন, তার বোন মুনিয়া আত্মহত্যা করেনি। তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এরপর বিষয়টি ধামাচাপা দিতে সুকৌশলে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। তার অভিযোগ এর আগেও মনিয়াকে ডেকে নিয়ে বিভিন্ন হুমকিধমকি দিয়ে ঢাকা থেকে কুমিল্লা পাঠিয়ে দেয়া হয়। এরপর আনভীর পুনরায় মুনিয়াকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ঢাকা এনে গুলশানের ফ্ল্যাটে ওঠায়। এ দিকে প্রশ্ন উঠেছে অভিযুক্ত বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীর এখন কোথায়? তিনি কি দেশে রয়েছেন নাকি ঘটনার দিন রাতেই দেশত্যাগ করেছেন। এ দিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, এই ঘটনার সাথে জড়িত কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।

নিহতের বোন নুসরাত দাবি করেন, মুনিয়া আত্মহত্যা করেনি। তাকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি বলেন, আনভির নিজেই মোবাইলে মুনিয়াকে বলেছিল, ‘আমি দুবাই চলে যাচ্ছি। তুমি কুমিল্লা চলে যাও, না হলে আমার মা তোমাকে মেরে ফেলবে।’ তিনি আরো বলেন, লাশ উদ্ধারের সময় মুনিয়ার দুই পা খাটের সাথে মেশানো ছিল। সে আত্মহত্যা করলে পায়ের নিচে ফাঁকা থাকার কথা। মুনিয়ার মেহেদী রাঙানো হাত দুটো কালচে বর্ণের ছিল। ঘটনার আগে যখন তাকে বিভিন্ন মাধ্যমে হুমকি দেয়া হচ্ছিল তখন মুনিয়া নুসরাতকে ফোন করে দ্রুত ঢাকায় আসতে বলে। বলে, ‘আনভীর তাকে ধোঁকা দিয়েছে। যেকোনো মুহূর্তে তার বিপদ হয়ে যেতে পারে।’ মুনিয়ার ফোন পেয়ে তিনি দ্রুতই ঢাকা আসার চেষ্টা করেছিলেন; কিন্তু লকডাউনের কারণে যানবাহন চলাচল না করায় কিছুটা দেরি করে ঢাকা পৌঁছালেও বোনকে জীবিত পায়নি।

পুলিশ বলছে, ঘটনাটি স্পর্শকাতর। এখানে হুটহাট করে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ নেই। তথ্য-প্রমাণ হাতে নিয়ে সামনের দিকে এগোতে হবে। তারা কোনো বিষয় বাদ রেখে তদন্ত করছে না। বরং সব বিষয় মাথায় রেখে কঠোর তদন্ত ও চুলচেরা বিশ্লেষণ করে সামনে এগোচ্ছে। এতে যিনিই অপরাধী প্রমাণিত হবেন তাকেই আইনের আওতায় আনা হবে। ইতোমধ্যে ওই বাড়ির সিসি ক্যামেরার ফুটেজ, নিহত মুনিয়ার লেখা ছয়টি ডায়েরি, প্রথমে তাকে বনানীর যে বাসায় রাখা হয়েছিল সেই বাসায় তদন্ত করা হচ্ছে। তাছাড়া মৃত্যুর আগে মুনিয়ার ফোনে যে সব কল এসেছে, যে সব কলা হয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তা ছাড়া সায়েম সোবহান আনভীরের পরিবারের সদস্যরা এর আগে মুনিয়াকে ডেকে নিয়ে কী ধরনের হুমকি দিয়েছিলেন, তার সাথে কারা জড়িত ছিল সে বিষয়ও তদন্ত হবে। সন্দেহভাজন আনভীর ঘটনার সময় কোথায় ছিলেন তা জানার চেষ্টা চলছে।

পুলিশ সূত্র আরো জানায়, বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ফোনকল রেকর্ড ছড়িয়ে পড়েছে। ওই ফোন কলে ৫০ লাখ টাকা দেনা-পাওনার একটি বিষয় রয়েছে। পুলিশ সেটিও তদন্ত শুরু করেছে। তা ছাড়া ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়া গেলেও মৃত্যুর ধরন সম্পর্কে জানা যাবে। এ দিকে ইমিগ্রেশন সূত্র বলছে, তাদের সিস্টেমে আনভীরের বিদেশ যাওয়ার তথ্য নেই। তার মানে তিনি দেশেই রয়েছেন।

এ দিকে আনভীর দেশে রয়েছেন নাকি ইতোমধ্যে বিদেশে চলে গেছেন তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কেউ বলছেন, ঘটনারদিন রাতেই তিনি বিশেষ বিমানে দুবাই চলে গেছেন। আবার কেউ বলছেন, তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে দেশেই রয়েছেন। এ বিষয়ে বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন সূত্র জানায়, কেউ বিদেশে গেলে বা দেশে এলে তার সব ডেটা ইমিগ্রেশন সিস্টেমে থাকে। কিন্তু আনভীরের বিদেশে যাওয়ার বিষয়টি তাদের সিস্টেমে নেই। সুতরাং তিনি দেশেই রয়েছেন।

জানতে চাইলে পুলিশ গুলশান বিভাগের উপকমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী বলেন, সব বিষয় সামনে রেখেই তদন্ত করা হচ্ছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পেলে অনেক কিছুই ক্লিয়ার হবে। এ ছাড়া ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে, ভিসেরা পরীক্ষাসহ সবকিছুই করা হচ্ছে। তিনি বলেন, মুনিয়া যদি আত্মহত্যা করে থাকেন তাহলে তিনি কেন আত্মহত্যা করলেন তা জানার চেষ্টা করা হবে। একই সাথে আত্মহত্যার পেছনে অন্য কারো ইন্ধন বা সম্পৃক্ততা রয়েছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সাথে ঘটনাটি যদি হত্যাকাণ্ড হিসেবে প্রমাণিত হয় তাহলে বিষয়টি পুরো পাল্টে যাবে।

অপর একটি সূত্র জানায়, বনানীর বাসায় থাকার আগে মুনিয়া মিরপুরের একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন। সেই বাসাতেও আনভীরের যাওয়া-আসা ছিল। ওই ফ্ল্যাটের মালিক মুনিয়ার কাছে জানতে চাইলে আনভীরকে তার স্বামী বলে পরিচয় করে দেন। এরপর সেখান থেকে বনানীর বাসায় শিফট হয়।

প্রসঙ্গত, গত সোমবার সন্ধ্যায় গুলশানের ১২০ নম্বর সড়কের ১৯ নম্বর বাসার একটি ফ্ল্যাট থেকে মুনিয়ার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় মুনিয়ার বড় বোন নুসরাত জাহান তানিয়া বাদি হয়ে বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি সায়েম সোবহান আনভীরের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচণার অভিযোগ এনে একটি মামলা দায়ের করেছেন।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, আনভিরের সাথে প্রেমের সম্পর্ক ছিল মুনিয়ার। প্রতি মাসে এক লাখ টাকা ভাড়ার বিনিময়ে আনভীর তাকে ওই ফ্ল্যাটে রেখেছিল। নিয়মিত সে ওই বাসায় যাতায়াত করত। তারা স্বামী-স্ত্রীর মতো করে থাকত। মুনিয়ার বোন অভিযোগ করেছেন, তার বোনকে বিয়ের কথা বলে ওই ফ্ল্যাটে রেখেছিল। একটি ছবি ফেসবুকে দেয়াকে কেন্দ্র করে আনভীর তার বোনের ওপর ক্ষিপ্ত হয়। তাদের মনে হচ্ছে, মুনিয়া আত্মহত্যা করেনি। তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। এর বিচার চান তারা।

এ দিকে কলেজছাত্রী মোসারাত জাহান মুনিয়ার মৃত্যুতে যেই জড়িত থাকুক না কেন তাকে ছাড় দেয়া হবে না বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। তিনি বলেন, অপরাধী যেই হোক তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে। গতকাল বুধবার দুপুরে ধানমন্ডির বাসভবনে তিনি এসব কথা বলেন, মন্ত্রী আরো বলেন, রাজধানীর গুলশানে কলেজছাত্রীর মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা আত্মহত্যার প্ররোচনা মামলার তদন্ত চলছে। তদন্তের পর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে। ‘আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে, যেই অপরাধী হোক না কেন তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে।

Exit mobile version