- ২৪ ডেস্ক
ভারতের রাজধানীর বুকে কূটনৈতিক দৃশ্যপটে রাতারাতি ঘটে গেল এক নাটকীয় পরিবর্তন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় যেখানে ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্বের জয়গান গাওয়া হচ্ছিল, ঠিক তার পরদিন সকালেই সুর পাল্টে গেল সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে।

বুধবার সকালে দিল্লির সাউথ ব্লকে তলব করা হয় ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাকে ডেকে পাঠিয়ে একগুচ্ছ অভিযোগ ও উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। মূলত ঢাকায় ভারতীয় মিশনের নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েই এই তলব বলে জানা গেছে।
ভারত সরকারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, ঢাকায় ‘কিছু চরমপন্থী গোষ্ঠী’ ভারতীয় দূতাবাস ঘেরাও করার মতো কর্মসূচি ঘোষণা করে নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করেছে। এছাড়া বাংলাদেশের কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সম্প্রতি যেসব মন্তব্য করেছেন, সেগুলোকে ‘উসকানিমূলক’ হিসেবে অভিহিত করে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে দিল্লি।
অথচ এর আগের দিন, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চাণক্যপুরীর বাংলাদেশ হাই কমিশন প্রাঙ্গণে ছিল উৎসবের আমেজ। বিজয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সেই অনুষ্ঠানে হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহ দুদেশের সম্পর্ককে ‘অর্গানিক রিলেশনশিপ’ বা অত্যন্ত নিবিড় হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবন উৎসর্গকারী ১৬৬৮ জন ভারতীয় সেনার আত্মত্যাগের কথা তিনি গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।
মঙ্গলবার সন্ধ্যার সেই অনুষ্ঠানে দিল্লির বিশিষ্টজনদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। অতিথিদের তালিকায় ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর উপপ্রধান জেনারেল রাকেশ কাপুর, ভারতের প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মণিশংকর আইয়ার এবং ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার বিভাগের প্রধান বি শ্যাম। এ ছাড়া ঢাকায় আগে দায়িত্ব পালন করে যাওয়া চারজন সাবেক কূটনীতিক এবং বিভিন্ন থিংকট্যাংক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। তবে এই তালিকার ক্রম বা উপস্থিতি বুধবারের বরফ গলাতে পারেনি।
একাত্তরের স্মৃতিচারণ করতে সেই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব এম কে রাসগোত্রাকে। ১০১ বছর বয়সী এই কূটনীতিক একসময় ইন্দিরা গান্ধীর উপদেষ্টা ছিলেন। হাইকমিশনার নিজে তার বাড়িতে গিয়ে তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে অসুস্থতার কারণে তিনি উপস্থিত হতে না পারলেও, তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ভোলেননি বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূত। অথচ এই সৌহার্দ্যপূর্ণ আবহের রেশ কাটার আগেই বুধবারের তলব সম্পর্কের ফাটলকে স্পষ্ট করে তোলে।
বুধবারের বৈঠকে ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বাংলাদেশে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে তারা বিচলিত। বিশেষ করে ‘জুলাই ঐক্য’ নামের একটি সংগঠনের ডাকে বুধবার বিকেলে ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাস অভিমুখে যে ‘মার্চ’ বা পদযাত্রা কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছিল, তা নিয়ে দিল্লি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। যদিও বাড্ডাতে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে সেই মিছিল আটকে দিয়েছিল।
দিল্লির অসন্তোষের আরেকটি বড় কারণ হলো সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্য। কিছুদিন আগেই এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বা ‘সেভেন সিস্টার্স’ নিয়ে যে মন্তব্য করেছিলেন, তা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল বলে মনে করে সাউথ ব্লক। এ ছাড়া বিজয় দিবসে ঢাকার একটি সড়কের নাম ‘ফেলানী এভিনিউ’ করার ঘোষণা এবং উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানের সীমান্ত হত্যা বিষয়ক বক্তব্যকেও ভারত ভালোভাবে নেয়নি।
সাউথ ব্লকের কর্মকর্তাদের মতে, হাসনাত আবদুল্লাহর মন্তব্যকে তারা হালকাভাবে দেখছেন না। কারণ অতীতে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর বাংলাদেশে আশ্রয় পাওয়ার অভিযোগ ছিল। ভারতের দাবি, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে একটি ‘মিথ্যা বয়ান’ তৈরির চেষ্টা চলছে, যা তারা প্রত্যাখ্যান করে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, রবিবারে ঢাকায় ভারতীয় রাষ্ট্রদূত প্রণয় ভার্মাকে তলব করার পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবেই বুধবার দিল্লিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। গত বছর দেড়েক ধরে দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বিবৃতি ও তলবের যে সংস্কৃতি চালু হয়েছে, এটি তারই ধারাবাহিকতা। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, তারা বাংলাদেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায়।









