বাণিজ্য চুক্তির অগ্রগতি পর্যালোচনায় আজ ঢাকায় আসছেন ব্রেন্ডান লিঞ্চ

Dhaka Post

যুক্তরাষ্ট্রের ‘অফিস অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ’ (ইউএসটিআর)–এর দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী ব্রেন্ডান লিঞ্চ তিন দিনের সফরে আজ মঙ্গলবার (৫ মে) ঢাকায় আসছেন। তার এই সফরের মূল লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সই হওয়া বাণিজ্য চুক্তির অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করা।

গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এটিই কোনো বাণিজ্য প্রতিনিধির প্রথম ঢাকা সফর।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সংলাপ জোরদারের লক্ষ্যেই ব্রেন্ডান লিঞ্চ ঢাকায় আসছেন। সফরে ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোক্যাল ট্রেড (এআরটি)’ বা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির বাস্তবায়ন, বিশেষ করে আমদানি-রপ্তানি ঘাটতি কমানো, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মার্কিন কৃষি ও জ্বালানি পণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি এবং চুক্তির নীতিগত সিদ্ধান্তের অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।

dhakapost
যুক্তরাষ্ট্রের ‘অফিস অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ’ (ইউএসটিআর)–এর দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী ব্রেন্ডান লিঞ্চ / ছবি- সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী ইউএসটিআর ব্রেন্ডান লিঞ্চ তিন দিনের সফরে আজ মঙ্গলবার ঢাকায় আসছেন। গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠনের পর এটিই কোনো মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির প্রথম ঢাকা সফর। এই সফরের মূল লক্ষ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই হওয়া ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোক্যাল ট্রেড (এআরটি)’ বা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির বাস্তবায়ন, বিশেষ করে আমদানি-রপ্তানি ঘাটতি কমানো, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মার্কিন কৃষি ও জ্বালানি পণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি এবং চুক্তির নীতিগত সিদ্ধান্তের অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা

ঢাকা ও ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, ব্রেন্ডান লিঞ্চের ঢাকা সফরে মূল বৈঠকটি হবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে। তিনি বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন। এছাড়া তিনি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন এবং পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

ব্রেন্ডান লিঞ্চের সফর নিয়ে সরকারের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (এআরটি) হয়েছে, সেটি নিয়েই মূলত কথা হবে। চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সামনে এগোতে চায়। মূলত এই চুক্তি সইয়ের পর এর ফলোআপ এবং অগ্রগতির পর্যালোচনা এই সফরের মূল লক্ষ্য।’

dhakapost
বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে শুল্ক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি সই করে বাংলাদেশ / ছবি- সংগৃহীত

সরকারের আরেক কর্মকর্তা চুক্তির বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ করে বলেন, ‘বাণিজ্য চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ৩৫০ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য (গম, সয়াবিন, তুলা ও ভুট্টা) কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া, আগামী ১৫ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশের ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের জ্বালানিপণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি রয়েছে। চুক্তির এমন বহু বিষয় এই আলোচনায় স্থান পাবে।’

লিঞ্চের সফর সম্পর্কে সোমবার ঢাকায় অবস্থিত মা‌র্কিন দূতাবাস এক বিজ্ঞপ্তিতে জা‌নি‌য়ে‌ছে, ব্রেন্ডান লিঞ্চের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা করতে ৫-৭ মে ঢাকা সফর করবে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, ব্রেন্ডান লিঞ্চের এই সফর দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সংলাপ জোরদারের লক্ষ্যে আয়োজিত। মার্কিন দূতাবাস জানিয়েছে, ৫-৭ মে প্রতিনিধিদলটি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা করবে। এই চুক্তি উভয় দেশের বাজারে প্রবেশ সহজ করবে, বিনিয়োগের বাধা দূর করবে এবং বাণিজ্যিক সুযোগ বাড়িয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি জোরদার করবে বলে যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাশা করে

বা‌ণিজ্য চু‌ক্তির প্রসঙ্গ টে‌নে মা‌র্কিন দূতাবাস উল্লেখ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নে অংশীদারত্বের প্রত্যাশা করে যুক্তরাষ্ট্র। এই চুক্তি উভয় দেশের বাজারে প্রবেশ সহজ করবে, বিনিয়োগের বাধা দূর করবে এবং বাণিজ্যিক সুযোগ বাড়িয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি জোরদার করবে।

dhakapost
চুক্তির আওতায় বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়েছে। যা ৩৭ শতাংশ পর্যন্ত ছিল / ছবি- সংগৃহীত

বিএনপি সরকার গঠনের পর গত মার্চের শুরুতে ঢাকা সফরে এসেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর। এরপর এপ্রিলের মাঝামাঝিতে তিন দিনের সফরে ঢাকায় আসেন মার্কিন বিশেষ দূত চার্লস জে. হার্ডার। এবার আসছেন দেশটির দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী ইউএসটিআর প্রতিনিধি ব্রেন্ডান লিঞ্চ।

উল্লেখ্য, বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে শুল্ক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি সই করে বাংলাদেশ। এই চুক্তি সইয়ের ফলে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্কের হার ১ শতাংশ কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়েছে।

চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শিল্প ও কৃষিপণ্যের জন্য উল্লেখযোগ্য অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা দিতে সম্মত হয়েছে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে— রাসায়নিক দ্রব্য, চিকিৎসা সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি, মোটরযান ও যন্ত্রাংশ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সরঞ্জাম, জ্বালানি পণ্য, সয়াবিন, দুগ্ধজাত পণ্য, গরুর মাংস, পোলট্রি, বাদাম ও ফল।

dhakapost
চুক্তির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ আগামী ৫ বছরে প্রতি বছর কমপক্ষে ৭ লাখ মেট্রিক টন মার্কিন গম আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে / ছবি- সংগৃহীত

এই সফরে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কৃষিপণ্য (গম, সয়াবিন) আমদানির প্রতিশ্রুতি এবং চুক্তির নীতিগত সিদ্ধান্তের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হবে। চুক্তির আওতায় জ্বালানি খাতে ১৫ বছরে ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এছাড়া, সম্প্রতি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস মার্কিন বোয়িং কোম্পানির ১৪টি উরোজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে, যা এই সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক

চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানিকারকদের জন্য দীর্ঘদিনের কিছু অশুল্ক বাধা দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর আওতায় বাংলাদেশ মার্কিন নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মান অনুযায়ী তৈরি গাড়ি গ্রহণ করবে, মার্কিন ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) অনুমোদিত ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম গ্রহণ করবে এবং পুনর্নির্মিত (রিম্যানুফ্যাকচারড) পণ্যের ওপর আমদানি নিষেধাজ্ঞা ও লাইসেন্সিং বাধা তুলে নেবে।

এছাড়া, ডিজিটাল বাণিজ্য সহজ করতে বাংলাদেশ সীমান্তপারের তথ্য প্রবাহের অনুমতি দেবে এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) ইলেকট্রনিক ট্রান্সমিশনের ওপর শুল্কমুক্ত নীতি বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান নেবে। পাশাপাশি কাস্টমস প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজেশন এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামো আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

dhakapost
সম্প্রতি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানির তৈরি ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে চুক্তি সই করে / ছবি- সংগৃহীত

চুক্তি অনুযায়ী, বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কৃষিপণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে রয়েছে— আগামী পাঁচ বছরে প্রতি বছর কমপক্ষে ৭ লাখ টন গম আমদানি। পাশাপাশি এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ১২৫ কোটি ডলার বা ২৬ লাখ টন মূল্যের সয়াবিন ও সয়াজাত পণ্য। এছাড়া, তুলা আমদানির পরিকল্পনার কথাও চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ মার্কিন উড়োজাহাজ, জ্বালানি এবং সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে সম্মত হয়েছে। চুক্তিতে সরাসরি কোনো কোম্পানির নাম উল্লেখ না থাকলেও প্রয়োজন অনুযায়ী উড়োজাহাজ কেনার কথা বলা হয়েছে।

dhakapost
গত বছর ১৫ সেপ্টেম্বর প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে ব্রেন্ডন লিঞ্চের সঙ্গে বৈঠকে করেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস / ছবি- সংগৃহীত

বাংলাদেশের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, সম্প্রতি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানির তৈরি ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে চুক্তি সই করেছে।

চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, জ্বালানি খাতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসসহ (এলএনজি) বিভিন্ন জ্বালানি পণ্য দীর্ঘমেয়াদে আমদানির উদ্যোগ নেবে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিসহ ১৫ বছরে প্রায় ১৫ বিলিয়ন (১ হাজার ৫০০ কোটি) মার্কিন ডলারের জ্বালানি পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া, প্রতিরক্ষা খাতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় বাড়ানোর বিষয়ে প্রচেষ্টা চালাবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনার পরিমাণ সীমিত রাখার কথাও চুক্তিতে বলা হয়েছে।

Source: https://www.dhakapost.com/exclusive/449871

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here