Site icon The Bangladesh Chronicle

বাংলাদেশ ইস্যুতে মিত্রদের পাশে পাচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র

বাংলাদেশ ইস্যুতে মিত্রদের পাশে পাচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্রবিএনপির গত ২৮ অক্টোবরের সমাবেশ ঘিরে সংঘর্ষের ঘটনার পর পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষ থেকে একটি যৌথ বিবৃতি প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু বিবৃতির ভাষা নিয়ে তাদের মধ্যে দেখা দেয় মতবিরোধ। একমত হতে সময় লাগে দু’দিন। এর পর যে বিবৃতি আসে, তাতে যুক্তরাষ্ট্রসহ সাতটি দেশ বাংলাদেশে নির্বাচনী পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানায়।

তবে সংঘর্ষের দিনই ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস এক বিবৃতিতে ঘটনার নিন্দা জানায়। ভিসা নিষেধাজ্ঞার ক্ষেত্রে ঘটনাগুলো পর্যালোচনা হবে বলেও উল্লেখ করে। ২৯ অক্টোবর এ ব্যাপারে পৃথক বিবৃতিতে শোক প্রকাশ করে ২৭ পশ্চিমা দেশের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। বিবৃতিতে বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পথ খোঁজার কথাও বলা হয়।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গত ২৮ অক্টোবরের ঘটনা ও বাংলাদেশ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইইউর অবস্থান স্পষ্টতই আলাদা।

এর আগে ঢাকা-১৭ আসনের উপনির্বাচনের প্রার্থী আশরাফুল হোসেন আলম ওরফে হিরো আলমের ওপর হামলার ঘটনায় ঢাকায় পশ্চিমা দেশের রাষ্ট্রদূতরা একটি যৌথ বিবৃতি দেওয়ার চেষ্টা করেন। তখনও বিবৃতির ভাষা নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে দু’দিন লাগে। শেষ পর্যন্ত ১৩টি দেশ শুধু ঘটনার নিন্দা জানিয়ে একটি বিবৃতি দেয়।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশ নিয়ে এমন বেশ কিছু ঘটনায় পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে একমত হতে যুক্তরাষ্ট্রকে বেগ পেতে হচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র যে ভাষায় বিবৃতি দিতে চাচ্ছে, অন্যরা তাতে রাজি হচ্ছে না। বিবৃতির ভাষা পরিবর্তনে শর্ত আসছে, ঐকমত্যে পৌঁছাতে সময় লাগছে। শেষ পর্যন্ত নমনীয় ভাষায় বিবৃতি দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশে আসন্ন সংসদ নির্বাচন ও শ্রম অধিকার বিষয়ে সম্প্রতি সমকালের পক্ষ থেকে ঢাকায় পশ্চিমা কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। নির্বাচন ও শ্রম অধিকার নিয়ে তাদের অবস্থান জানতে চাওয়া হয়। তবে কেউই এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে অনানুষ্ঠানিক বক্তব্যে তারা তাদের অবস্থান তুলে ধরেন।

যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে বলেছে, তারা বাংলাদেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন প্রত্যাশা করে। এজন্য সংলাপ করার আহ্বান জানিয়েছে তারা। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করলে ভিসা না দেওয়ার কথাও বলে দিয়েছে ওয়াশিংটন। এদিকে রাশিয়া ও চীন তাদের অবস্থান পরিষ্কার করে বলেছে, নির্বাচন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়, যা সংবিধান অনুযায়ী হবে।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করছে বলেও মনে করে রাশিয়া ও চীন। বাংলাদেশ নিয়ে অবস্থান পরিষ্কার করেছে এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মিত্র বলে পরিচিত ভারত। তবে নির্বাচন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের মতের বিপরীতে গিয়ে ভারত বলেছে, নির্বাচন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়।
বাংলাদেশ নিয়ে ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ইতালি, নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড ও জাপানের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, কৌশলগত লক্ষ্য ও অগ্রাধিকার রয়েছে। তাই বাংলাদেশে নির্বাচন ও শ্রম অধিকার ইস্যুতে তাদের পাশে পাচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র। যদিও বৈশ্বিক নানা ইস্যুতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকায় পশ্চিমা এক কূটনীতিক জানান, বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দেখতে চায় তাঁর দেশ। তবে নির্বাচন সে রকম না হলে তারাও যুক্তরাষ্ট্রের পথেই হাঁটবে কিনা– সেই প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র তার নিজের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সিদ্ধান্ত নেয়। আর আমাদের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে আমরা সিদ্ধান্ত নিই। অগ্রাধিকার যদি মেলে কেবল তখনই সিদ্ধান্ত এক রকম হতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার মিল থাকার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। আমরা কেবল আহ্বান জানাতে পারি, এর বেশি নয়।’

বাংলাদেশ ইস্যুতে পশ্চিমা মিত্ররা কি তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নেই? বিষয়টি নিয়ে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মন্তব্য জানতে চাইলে তারা জানায়, এই মুহূর্তে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য নেই।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র যখন র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) ও এর কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তখন অনেকের ধারণা ছিল, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা একাধিক দেশ থেকে র‌্যাবের ওপর একই নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে। তবে বাস্তবে তা দেখা যায়নি।

এয়ারবাস ব্যবসায় যুক্ত একটি দেশের রাষ্ট্রদূত সমকালকে বলেন, ‘সম্প্রতি ফ্রান্সের সঙ্গে বাংলাদেশের এয়ারবাস নিয়ে বড় চুক্তি হয়েছে। আমাদেরও এমন ব্যবসা রয়েছে। এ অবস্থায় অন্যের জন্য আমরা কারও সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করতে পারি না।’

পাকিস্তানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘দেশটিতে আমাদের দূতাবাস রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সেখানে কী করছে, সে বিষয়ে আমরা প্রতিনিয়ত খবর পাই। পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম কয়েক মাস ইমরান খানের নাম পর্যন্ত লিখতে পারেনি। গণতন্ত্রের ধারা দুই দেশে দুই রকম হতে পারে না।’

যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে পরিচিত পূর্বের একটি দেশের কূটনীতিক সম্প্রতি সমকালকে বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চাই। তবে তা না হলে কিছুই করার নেই। কারণ, অন্যকিছু করা আমাদের নীতি নয়।’

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশে শ্রম অধিকার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে কঠোর হবে, তা আগে থেকেই আঁচ করা যাচ্ছিল। কারণ, আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার অ্যান্ড কংগ্রেস অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল অর্গানাইজেশন্স (এএফএল-সিআইও) বিশ্বের সব দেশে শ্রম অধিকার নিয়ে জোরালো ভূমিকা রাখার চেষ্টা করে। তাছাড়া, শ্রম অধিকারের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র তাদের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করেছে। শ্রম অধিকার লঙ্ঘন হলে ভিসা ও বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগের হুমকিও দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

আর বাংলাদেশে যেহেতু শ্রম অধিকারের ঘাটতি রয়েছে, তাই যুক্তরাষ্ট্রের ওই ঘোষণার ব্যাপারে ঢাকায় চিঠি পাঠিয়ে সতর্ক করেছে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাস।

বাংলাদেশে শ্রম অধিকারের বিষয়টি আলাদাভাবে দেখছে ইইউ। সম্প্রতি ইইউর জিএসপি পর্যালোচনা দলের সফর প্রসঙ্গে ঢাকায় সংস্থাটির রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াইটলি সমকালকে বলেন, ‘বাংলাদেশে শ্রম অধিকার বাস্তবায়নে অগ্রগতি চলমান। ইইউর জিএসপি পর্যালোচনা দলের সফর ফলপ্রসূ হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার যাদের সঙ্গে বৈঠক করতে চেয়েছিল, সবার সঙ্গেই বৈঠক হয়েছে। ট্রেড ইউনিয়ন ও
অন্য সংশ্লিষ্টদের সঙ্গেও বৈঠক হয়েছে।’ জিএসপি সংক্রান্ত বিষয়ে ভবিষ্যতে কোথায় সহযোগিতার প্রয়োজন প্রতিনিধি দল তা বুঝতে পেরেছে বলে উল্লেখ করেন চার্লস হোয়াইটলি।

তিনি আরও বলেন, ‘শ্রম অধিকার নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে ইইউর সম্পর্ক বেশ পুরোনো। অনেক বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইইউর মিল রয়েছে। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে ইইউ নিজস্ব ভঙ্গিতে কাজ করে।’ ইইউ যেভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করছে তাতে ভালো ফল আসছে উল্লেখ করে হোয়াইটলি বলেন, ‘শ্রম অধিকারের বিষয়গুলো সমাধান করতে ইইউর বাজারে বাংলাদেশের জন্য ২০৩২ সাল পর্যন্ত সময় রয়েছে।’

আসন্ন সংসদ নির্বাচন নিয়ে ইইউর অবস্থানও কি যুক্তরাষ্ট্রের মতো– এই প্রশ্নে ইইউ রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘জিএসপির মতো অন্য বিষয়েও ইইউর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। আমরা আলোচনা করে ইইউর মতো করেই বিষয়গুলো দেখভাল করি। আর নির্বাচনী বিষয় দেখতে ইইউর একটি স্বাধীন বিশেষজ্ঞ দল বাংলাদেশে রয়েছে।’

কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, পশ্চিমা মিত্রদের অগ্রাধিকারে ভিন্নতা রয়েছে। এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান কৌশলগত লক্ষ্য হচ্ছে চীনের আধিপত্য ঠেকানো। কিন্তু এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র খুব একটা সুবিধা করতে না পারলেও চীন বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ও আধিপত্য বাড়িয়েছে।

সমকাল

Exit mobile version