বিএনপির বহু নেতা ও কর্মী জেলে ছিলেন নির্বাচনকালে। অনেক আসনে কথিত ডামি প্রার্থী দেয়া হয়েছিল। এসব রাজনীতিককে সামনে আনা হয়েছিল, যাতে নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছে এটা দেখানো যায়। তারা স্বতন্ত্র বা নামমাত্র অন্য দলের প্রতিনিধিত্ব করে নির্বাচন করেছেন।
বিশ্ববাসী যখন গাজা ও ইউক্রেন যুদ্ধের দিকে বেশি দৃষ্টি দিয়েছে, তখন শেখ হাসিনা হয়তো জানতেন যে, বাংলাদেশের নির্বাচনের দিকে কারো কোনো আকর্ষণ থাকবে না। ভোটারদের ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। যেসব মানুষ রাষ্ট্রীয় কল্যাণমূলক সুবিধা পান তাদেরকে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা সতর্ক করেছেন যে, ভোট না দিলে প্রদেয় সুবিধা কেড়ে নেয়া হবে। ২০১৮ সালে বিরোধীরা নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য নেতাদের প্রার্থী করেছিল। কিন্তু নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম এবং নির্বাচন অনুষ্ঠানে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে আওয়ামী লীগের অস্বীকৃতির কারণে, বিরোধীরা এ বছর নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেন।
যদিও আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী বলে মনে করা হচ্ছে, নির্বাচনে ভোট পড়েছে শতকরা মাত্র ৪০ ভাগ। ২০১৮ সালের নির্বাচনের তুলনায় এই হার অর্ধেক। একই সঙ্গে এবার নির্বাচনে ভোটের এই হার গত তিন দশকের মধ্যে সর্বনি¤œ ভোটের অন্যতম। ভোটের এই হার নিয়ে এমনকি পর্যবেক্ষকদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে। প্রতিশোধ নেয়া হতে পারে এ ভয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সূত্র বলেছেন, তিনি ৭ই জানুয়ারি ভোট চলাকালে বেশ কয়েকটি বুথ পরিদর্শন করেছেন। তিনি রিপোর্ট করেছেন যে, কিছু বুথে দুপুর ২টা পর্যন্ত হাতেগোণা কিছু ভোটার ছিলেন। কোনো কোনো স্থানে ভোট দিয়েছেন শতকরা ৫ থেকে ১০ ভাগের মধ্যে। স্থানীয় সময় বিকাল ৩টায় বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনার বলে, ভোট দিয়েছেন শতকরা ২৭ ভাগ ভোটার। তারপর বিকাল ৪টায় ভোট গ্রহণ শেষ হয়। শেষের এক ঘণ্টায় ওই হার দ্রুত বেড়ে শতকরা ৪০ ভাগে উঠে যায়।
৭ই জানুয়ারি এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে দমনপীড়ন অব্যাহত রাখে শেখ হাসিনার সরকার। নির্বাচনের ঠিক আগে স্থানীয় একটি আদালত ক্ষুদ্রঋণের প্রবক্তা ও শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী একমাত্র বাংলাদেশি প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে শ্রম আইন লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত করে ৬ মাসের জেল দেয়। এই মামলায় আপিল করতে পারবেন ইউনূস। এক সময় তিনি বিরোধী রাজনৈতিক দল গঠনের মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন। শেখ হাসিনা তাকে ‘গরিবের রক্তচোষক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাবেক সেক্রেটারি জেনারেল আইরিন খান এই রায়কে বিচারের নামে প্রতারণা হিসেবে অভিহিত করেছেন।
নির্বাচনের বেশ কয়েক মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। যারা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করেছেন বা এতে জড়িত ছিলেন বলে যুক্তরাষ্ট্র মনে করেছে, তাদের বিরুদ্ধেই এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর মধ্যে আছেন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, ক্ষমতাসীন দল এবং বিরোধী দলের নেতারা। নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এই নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি। এখন সামনে অগ্রসর হতে উভয় সঙ্কটের মুখে যুক্তরাষ্ট্র। তাকে অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে যে, তাদের নিজস্ব কূটনীতিকরা সমালোচনা করেছেন এমন একটি নির্বাচনে নেতা নির্বাচিত হয়েছে বাংলাদেশ সরকারে। অন্যদিকে ইসলামপন্থি উগ্রবাদীদের দমনে ঢাকা যে সমর্থন দিয়েছে তার প্রশংসা করে ওয়াশিংটন।
নির্বাচনের ফল নিয়ে হয়তো সন্তুষ্ট ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তার প্রয়োজন আঞ্চলিক অংশীদার, বিশেষ করে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে তা আরও বেশি প্রয়োজন। ২০১৯ সালে পুলওয়ামা হামলায় কমপক্ষে ৪০ জন ভারতীয় সেনা সদস্য নিহত হন। তারপর থেকে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আরও খারাপ হয়েছে। এমন খারাপ হয়েছে যে, তারা সশস্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত হতে পারে। বছরের শুরুতে ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে নরেন্দ্র মোদির একটি অবকাশ যাপনকে কেন্দ্র করে মালদ্বীপের সঙ্গে কূটনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয় ভারতের। তা শেষ হয়েছে। ওই বিরোধে নরেন্দ্র মোদির সমর্থকরা মালদ্বীপের চেয়ে ভারতের সমুদ্র সৈকতের প্রশংসা করেছিল এবং মালদ্বীপকে আরও বেশি করে চীনা শিবিরের দিকে ঠেলে দেয়া হয়। সর্বশেষ শ্রীলঙ্কায় ভারতীয় একটি পরিবেশবান্ধব প্রকল্পের সম্ভাব্য বিচ্ছেদ নিয়ে কলম্বোর সঙ্গে সম্পর্কে ছায়া ফেলেছে।
শেখ হাসিনা সব সময়ই নরেন্দ্র মোদির সমর্থন পাচ্ছেন। অনেক বছর ধরে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা যারা বাংলাদেশে নিরাপদে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল তাদের কর্মকাণ্ডকে খর্ব করায় ভারতীয় কৌশলে সহায়তা করেছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে ভারতের সন্ত্রাসবিরোধী অপারেশনে সহযোগিতা করে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বঙ্গোপসাগরে বড় একটি অর্থনৈতিক উদ্যোগে নয়া দিল্লির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে ঢাকা। এই উদ্যোগের নাম বিমসটেক। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জ্বালানি, পর্যটন, প্রযুক্তি, কৃষি ও মৎস্যচাষসহ গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে একসঙ্গে আঞ্চলিকভিত্তিক কাজ করার জন্য রাষ্ট্রগুলোকে একত্রিত করাই এর উদ্দেশ্য। বিতর্কিত বিষয়গুলো এখন পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ব্যাপকভাবে ক্ষতি করতে পারেনি। এর মধ্যে আছে সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশের সময় ডকুমেন্ট ছাড়া বাংলাদেশিদের গুলি করে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীদের হত্যার ঘটনা। সীমান্ত ইস্যুটি ভারতের অভ্যন্তরীণ সঙ্কটের মূলে আঘাত করেছে। আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাংলাদেশ ইসলামপন্থি উগ্রবাদীতে ভরা, যারা ভারতের জন্য হুমকি এবং কাজের সন্ধানে সীমান্ত অতিক্রম করে যাওয়া অতিরিক্ত সময় অবস্থান করা অভিবাসীতে ভরা হিসেবে দেখে থাকে ভারতে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি বিজেপি। (ভারতে বাংলাভাষী লোকজনকে, বিশেষ করে মুসলিমদেরকে মাঝে মাঝে বাংলাদেশি হিসেবে মনে করা হয়। তারা ভারতীয় মুসলিম অথবা বৈধ অভিবাসী হওয়া সত্ত্বেও তাদেরকে অবৈধ হিসেবে দেখে ভারত)।
বিএনপিকে কখনো কখনো তার মিত্র জামায়াতে ইসলামীর কারণে সন্দেহ পোষণ করে নয়া দিল্লি। এ কারণে শেখ হাসিনার ওপর আস্থা রাখে ভারত। ঢাকার সঙ্গে নয়া দিল্লির অংশীদারিত্ব অধিক পরিমাণ বাংলাদেশির কাছ থেকে সরে যাওয়া শুরু করেছে। যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের সক্রিয় সমর্থনের কথা জোর দিয়ে স্মরণ করেন, এর মধ্যে আছেন তারাও। ওই যুদ্ধের সময় এক কোটি বাস্তুচ্যুত মানুষকে শরণার্থীর সহায়তা দিয়েছিল ভারত। ভারতে পাকিস্তান হামলা চালানোর পর ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে সামরিক অভিযানে যোগ দেয় ভারত। এর দু’সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। সেই সদিচ্ছার অনেকটাই ভেঙে পড়েছে।
শেষ পর্যন্ত দুই উপায়েই ভারত চায় এটা। ভারত চায় বিদ্রোহীদের দমনে শেখ হাসিনার সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে তার সমর্থন। কিন্তু এক্ষেত্রে আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অর্জনের দিক দেয়ে বাংলাদেশকে অন্ধকারে ফেলে দেয়া হয়। এর বিনিময়ে বাংলাদেশের জন্য তদবির করতে আগ্রহী ভারত এবং এখানকার মানবাধিকার রেকর্ড এড়িয়ে যেতে, যাতে চীনের প্রভাবের অধীনে আরও সরে না যায় বাংলাদেশ। এই মনোভাব এ পর্যন্ত কাজ করেছে। কিন্তু এসব নির্ভর করে শেখ হাসিনার শাসন ক্ষমতার ওপর। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বহীন ভবিষ্যত বাংলাদেশ সরকার এবং শেখ হাসিনার প্রতি অনুগত নয় এমন সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের দিক দিয়ে ক্ষীণ দৃষ্টিভঙ্গি নিতে পারে। বাংলাদেশে ৪৫ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক শিল্পকে যেসব শ্রমিক এগিয়ে নিচ্ছেন এবং যেসব অভিবাসী শ্রমিক কঠিন পরিবেশে কাজ করে দেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রেমিটেন্স পাঠাচ্ছেন, তাদের অর্থে বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত উপরে উঠে যাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী অন্য দেশগুলোর তুলনায় এক্ষেত্রে বাংলাদেশ এগিয়ে। কিছু আর্থ সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ এখন এ অঞ্চলের প্রচলিত ফ্রন্টরানার শ্রীলঙ্কাকে টপকে যাচ্ছে। এরই মধ্যে ভারতকে তারা পিছনে ফেলেছে। সামাজিক সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং আভ্যন্তরীণ সম্পদ দিয়ে সরকারি পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করেছে বাংলাদেশ। কিন্তু উন্নতি করার আরও অনেক জায়গা আছে। এখানে অর্থনৈতিক সফলতার কৃতিত্ব যায় এর উদ্যোক্তাদের কাছে।
বাস্তবতা হলো রাজনৈতিক বিরোধীদের জন্য একটি অনিরাপদ স্থান হলো বাংলাদেশ। বিচারহীন আটক এবং নির্যাতন নিয়ে উদ্বেগ চলমান। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চলমান। অধিকারকর্মীদের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করেছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার ঝুঁকি কম থাকলে সরকার দায়মুক্তি দিয়ে কাজ করতে সক্ষম হয়। ১৯৯৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নিশ্চিত করেছিল তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর। ওই সব নির্বাচনের প্রতিটিতে হেরেছিল ক্ষমতাসীন দল। কিন্তু সেই ব্যবস্থা অনেক আগেই হারিয়ে গেছে। এই ব্যবস্থা বাতিল করেছে আওয়ামী লীগ সরকার।
জনগণের ইচ্ছার প্রতিনিধিত্ব করে না এমন একটি সরকারের চেয়ে বাংলাদেশ একটি উন্নত সরকার দাবিদার। ২০০০-এর দশকের মধ্যভাগে বাংলাদেশ শাসন করেছেন শেখ হাসিনা ও তার প্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়া। শেষোক্তজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তিনি বাংলাদেশের সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্ত্রী। তাদেরকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করে দেয়ার ধারণা কিছু জেনারেল অনুমোদন করাতে চাইছিলেন। তাতে সমর্থন দিয়েছিলেন ঢাকার কিছু বুদ্ধিজীবী এবং এর বাইরের মানুষ। কিন্তু এই সমাধান যদি টিকে থাকতে হতো, তবুও তা হতো বাংলাদেশিদের সিদ্ধান্তের বিষয়। পরের নির্বাচন আদর্শগতভাবে সব দলকে নিয়ে করতে হবে। ঢাকাকে অবশ্যই এমন একটি নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্য পথ সৃষ্টি করতে হবে, যেখানে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত হয় এবং নেতৃত্বের ন্যূনতম বৈধতা থাকে।
বিএনপি ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করেছিল। অংশগ্রহণ করেছিল ২০১৮ সালের নির্বাচনে। আবার ২০২৪ সালের নির্বাচন বর্জন করেছে। এর কোনোটাই বাংলাদেশের মঙ্গল আনেনি। দেশের ভিতরে উন্নয়নমূলক কাজের জন্য বেসরকারি খাত প্রশংসা অর্জন করেছে। বাংলাদেশি একটি এনজিও আফ্রিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কার্যক্রম চালাচ্ছে। আভ্যন্তরীণ এনজিওগুলোর উন্নয়ন উদ্যোগ উৎসাহিত করছে জনস্বাস্থ্য এবং নারীর ক্ষমতায়ন, যা অসাধারণ। এসব স্বেচ্ছাসেবকদের কারণে বহু আর্থ সামাজিক অর্জন হয়েছে। কিন্তু নাগরিকরা এখন নিজেদেরকে অসহায় মনে করছেন: তারা এমন একটি দেশে বাস করেন যেখানে গণতন্ত্র আছে মনে হলেও তার চেতনা নষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশে যদি অগ্রগতি অব্যাহত থাকে, তাহলে আবারও তা হবে সরকারের জন্য নয়।
মানব জমিন