অর্থনৈতিক রিপোর্টার
৮ ডিসেম্বর ২০২৫, সোমবার 
চলতি বছরের নভেম্বরে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি সামান্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.২৯ শতাংশে। এর আগের মাস অক্টোবরে হার ছিল ৮.১৭ শতাংশ। আর
গত বছরের নভেম্বরে এ হার ছিল ১১.৩৮ শতাংশ। অবশ্য গত কয়েক মাস ধরে দেশের মূল্যস্ফীতি ওঠা-নামার মধ্যে থাকলেও ৮ শতাংশের ঘরেই ঘুরপাক খাচ্ছে। তিন বছর ধরেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেশের অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ১০.০৩ শতাংশ। সবজির ভরা মৌসুমে সাধারণত খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতি কমে। অথচ পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে নভেম্বরে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছে সাধারণ মানুষ।
রোববার বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মূল্যস্ফীতির চাপে ভোক্তারা জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন, ফলে তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। তারা ফল, মাছ, মাংসের মতো প্রয়োজনীয় খাদ্য ও অন্যান্য সামগ্রীর পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছেন। বিশেষ করে নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনে তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, এক মাসের ব্যবধানে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতিও কিছুটা বেড়েছে। চলতি বছরের নভেম্বরে খাদ্য খাতে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৭.৩৬ শতাংশে, যা আগের মাস অক্টোবরে ছিল ৭.০৮ শতাংশ। তবে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি কমেছে। এক বছর আগে, অর্থাৎ ২০২৪ সালের নভেম্বরে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি ছিল ১১.৩৮ শতাংশ।
মূল্যস্ফীতির বোঝা সবচেয়ে বেশি পড়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর। আয় বাড়লেও যখন তা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না, তখন প্রকৃত আয় কমে যায়। ফলে খরচ মেটাতে মানুষকে কম খেতে, কম পরতে বা ধারদেনা করতে হয়। বিবিএস জানিয়েছে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮.০৪ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির (৮.২৯ শতাংশ) চেয়ে কম। এর মানে হলো, মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম।
খাদ্য খাতে চাপ, নন-ফুডে সামান্য স্বস্তি: বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, এক মাসের ব্যবধানে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৭.৩৬ শতাংশ, যা অক্টোবর মাসে ছিল ৭.০৮ শতাংশ। টানা দুই মাস ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী। তবে গত বছরের নভেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১৩.৮০ শতাংশ, অর্থাৎ বছরওয়ারি হিসাবে খাদ্য খাতে চাপ কিছুটা কমেছে। খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবায় নভেম্বরে মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে দাঁড়িয়েছে ৯.০৮ শতাংশে। অক্টোবর মাসে এ হার ছিল ৯.১৩ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ে তা ছিল ৯.৩৯ শতাংশ।
‘মূল্যস্ফীতি কমা’ মানে দাম কমা নয়: বিবিএস উদাহরণ দিয়ে বলছে, ২০২৪ সালের নভেম্বরে কোনো পণ্য ও সেবার ঝুড়ি কিনতে খরচ হতো ১০০ টাকা। এক বছর পর ২০২৫ সালের নভেম্বরে একই পণ্য-সেবা কিনতে লেগেছে ১০৮ টাকা ২৯ পয়সা। প্রতি ১০০ টাকায় ব্যয় বেড়েছে ৮ টাকা ২৯ পয়সা। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি কমলেও বাজারদর কমে না, শুধু দাম বাড়ার হার কিছুটা কমে, এটাই বোঝায়।
মূল্যস্ফীতির হার কমে যাওয়া মানে জিনিসপত্রের দাম কমে যাওয়া নয়। অন্যান্য মাসের তুলনায় ওই নির্দিষ্ট মাসে দাম বৃদ্ধি হয়তো কিছুটা কম হয়েছে, এটাই বোঝায়। উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে বাজার থেকে পণ্য ও সেবা কিনতে যদি আপনার খরচ হয় ১০০ টাকা। এ বছরের নভেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি ৮.২৯ শতাংশ হওয়ার মানে হলো, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে অর্থাৎ এক বছর পর একই পণ্য ও সেবা কিনতে আপনাকে ১০৮ টাকা ২৯ পয়সা খরচ করতে হয়েছে। প্রতি ১০০ টাকায় আপনার খরচ বেড়েছে ৮ টাকা ২৯ পয়সা।
সরকার ও নীতিনির্ধারকদের উদ্যোগ: উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে অন্তর্বর্তী সরকার সুদের হার বাড়ানোর পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনায় কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। এনবিআর নিত্যপণ্য, তেল, আলু, পিয়াজ, ডিম সহ বেশ কিছু পণ্যে শুল্ককর কমিয়েছে। এ ছাড়া, আমদানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবুও মূল্যস্ফীতি এখনো মনঃপুত পর্যায়ে নামানো যায়নি। অর্থনীতিবিদদের মতে, স্থিতিশীল মুদ্রানীতি, কার্যকর বাজার তদারকি, আমদানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং সরবরাহ পরিস্থিতি উন্নত না হলে মূল্যস্ফীতির চাপ কাটানো কঠিন হবে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কবির হোসেন বলেন, সংসারের ব্যয় বেড়েই চলেছে। কিন্তু সে তুলনায় আয় তেমন বাড়ছে না। এতে বাসা ভাড়া দিতে ও খাদ্যপণ্য কিনতে খুব কষ্ট হচ্ছে। পণ্যের দাম অস্বাভাবিক বাড়ায় পরিবার নিয়ে চলা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। ব্যয় কাটছাঁট করে সংসার সামলাতে হচ্ছে।









