ত্রাণ তহবিলের সাহায্য-হকদার-বেহকদার

Daily Nayadiganta

বাংলা ‘ত্রাণ’ শব্দটি বিশেষ্য। ত্রাণের সমার্থক বা প্রতিশব্দ হচ্ছে উদ্ধার, সাহায্য, সহায়তা, প্রতিকার, মুক্তি, পরিত্রাণ, রক্ষা প্রভৃতি। সহজ-সরলভাবে বলতে গেলে বলতে হয় ত্রাণ অর্থ বিপদ থেকে পরিত্রাণ। এর সূত্র ধরে বলা যায়, ত্রাণ হচ্ছে একজন ব্যক্তিকে নিত্য দুঃখ-কষ্ট, দুর্বিপাক বা দারুণ যন্ত্রণা থেকে রক্ষা। ত্রাণের আক্ষরিক ইংরেজি জবষরবভ. জবষরবভ -এর সমার্থক বা প্রতিশব্দ হচ্ছে ঝধষাধঃরড়হ, উবষরাবৎধহপব, জবংপঁব, ঝঁপপড়ঁৎ, চৎড়ঃবপঃরড়হ, চৎবংবৎাধঃরড়হ প্রভৃতি। ইংরেজিতে একবাক্যে জবষরবভ বলতে বোঝায় ঞযব ংধারহম ড়ভ ধ সধহ ভৎড়স বঃবৎহধষ সরংবৎু.

ত্রাণ শব্দটির মতো তহবিল শব্দটিও বিশেষ্য। তহবিল অর্থ সঞ্চিত ভণ্ডার। এ সঞ্চিত ভাণ্ডারটি এমন এক ভাণ্ডার যা থেকে অর্থ সংস্থান, অর্থায়ন, অর্থ বরাদ্দ, ব্যয় বরাদ্দ, অর্থ সাহায্য, মঞ্জুরি, অনুদান প্রভৃতি দেয়া হয়। তহবিলের ইংরেজি হচ্ছে ঋঁহফ, ঈধংয, অ ঃৎবধংৎু প্রভৃতি।

বাংলাদেশে বসবাসরত মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত বেশির ভাগ বাঙালির হৃদয় অত্যন্ত কোমল। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল সমুদ্রসংলগ্ন। এ অঞ্চলে প্রতিদিন দু’বার জোয়ার-ভাটা হয়। জোয়ারের কারণে মানুষ আবেগাপ্লুত ও উদ্বেলিত হয় এবং পরমুহূর্তেই ভাটার কারণে সে আবেগ ও উদ্বেলতা দূরীভূত হয়। তাই জোয়ার-ভাটার মতো এ দেশের মানুষের মন দোদুল্যমানতায় ভরা, যে কারণে অনেকের পক্ষে সিদ্ধান্তে অটল থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। ভারত, ভুটান, নেপাল, সিকিম, চীন ও মিয়ানমারে উৎপত্তিস্থল এমন ৫৪টি নদী বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সাগরে পড়েছে। ভূ-ভাগের আবর্জনা ও বর্জ্য নদীবাহিত হয়ে সাগরে পড়ে। আবর্জনা ও বর্জ্য সাগরে নিয়ে যাওয়া নদীর একটি অন্যতম ধর্ম। নদীর এ ধর্ম এ ভূ-ভাগে বসবাসরত মানুষের ওপর ক্রিয়াশীল। তাই এ অঞ্চলের মানুষ অল্প সময়ের মধ্যে হিংস্র্রতা, হানাহানি, বিভেদ, পঙ্কিলতা, ঘৃণা, বিদ্বেষ প্রভৃতি ভুলে গিয়ে শত্রুকে বুকে আগলে নেয়।

যেকোনো জাতীয় দুর্যোগে বাঙালিদের দেখা গেছে, দল-মত নির্বিশেষে দুস্থ, অসহায়, নিঃস্ব, অবহেলিত, বঞ্চিত, ভাগ্যাহত, বিপদগ্রস্ত, অনাথ, জরাগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে। উদারহণস্বরূপ বলা যায়, ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড়, ১৯৮৮-র ভয়াবহ বন্যা, ১৯৯১-এর ৩০ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়, ১৯৯৮-র বন্যা, ২০০৭ এর ১৬ নভেম্বরের সিডর নামক ঘূর্ণিঝড় এবং ২০১৩ এর ২৪ এপ্রিল রানাপ্লাজা ধস। উপরোক্ত প্রতিটি জাতীয় দুর্যোগে এ দেশের মানুষ বিপন্ন ও অসহায় মানবতার সেবার অনন্য নজির স্থাপন করেছে।

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের পুনর্গঠনে এবং উপরোক্ত প্রতিটি জাতীয় দুর্যোগে বিদেশ থেকে প্রচুর ত্রাণসামগ্রী এসেছে। ১৯৮৮ সালে প্রশাসনিক আদেশ বলে রাষ্ট্রপতির ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল সৃজন পূর্ববর্তী ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয় যাবতীয় ত্রাণসংক্রান্ত কার্য পরিচালনা করত। ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী ১৯৯১ সালে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থার পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হলে এ ত্রাণ তহবিলের নাম পরিবর্তন করে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ভিখারি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপতি এবং সব শ্রেণী ও পেশার মানুষের অনুদান রয়েছে।

জাকাত ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি। জাকাত দেয়া প্রতিটি নেসাব পরিমাণ সম্পদশালী মুসলমানের জন্য ফরজ। ইসলামী পরিভাষায় ধনী ব্যক্তিদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদের নির্দিষ্ট অংশ গরিব-অভাবী লোকদের মধ্যে বিতরণ করে দেয়াকে জাকাত বলে। যারা জাকাতের অর্থ গ্রহণের যোগ্য তারা ত্রাণ তহবিল থেকে অর্থ গ্রহণ করতে পারেন। জাকাত গ্রহীতাকে নিশ্চিত হতে হবে তিনি জাকাত গ্রহণের যোগ্য কি না। যারা দুস্থ, অসহায়, গরিব, সহায়সম্বলহীন, অক্ষম এবং শরিয়তের বিধান অনুযায়ী জাকাত গ্রহণের যোগ্য একমাত্র তারাই ত্রাণ তহবিল থেকে অনুদান বা সাহায্য গ্রহণ করতে পারেন।

যেসব লোকের ওপর জাকাত ফরজ তারা হচ্ছেন- প্রথমত মুসলমান হতে হবে, নিসাবের মালিক হতে হবে, নিসাব পরিমাণ সম্পদ প্রয়োজনের অতিরিক্ত হওয়া, ঋণগ্রস্ত না হওয়া, সম্পদ এক বছরকালীন স্থায়ী হওয়া, জ্ঞানসম্পন্ন হওয়া, বালেগ হওয়া।

জাকাত কাদের দেয়া যাবে সে সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং নির্ধারণ করে দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, জাকাত কেবল নিঃস্ব, অভাবগ্রস্ত ও জাকাতসংশ্লিষ্ট কর্মচারী, যাদের চিত্ত আকর্ষণ করা হয় তাদের জন্য, দায়মুক্তি, ঋণভারাক্রান্ত, আল্লøাহর পথে সংগ্রামকারী ও মুসাফিরদের জন্য। এটি আল্লøাহর বিধান।’ (সূরা আত তাওবা, নং ৬০)

সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, পদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, উচ্চ আদালতের বিচারক, রাজনীতিবিদ, শিক্ষক প্রমুখ রাষ্ট্রীয় কোষাগার এবং প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে অর্থ সাহায্য নেয়ায় এর আইনগত ভিত্তি, যৌক্তিকতা ও যথার্থতা বিষয়ে জনমনে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে।
যত দূর জানা যায়, রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে চিকিৎসা বিল বাবদ সরকারের মঞ্জুরিকৃত অর্থ দেয়া হয়েছে এবং ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে যথার্থতা বিবেচনায় চিকিৎসা বিল বাবদ অর্থ প্রদান করা হয়েছে।

দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধান অনুযায়ী সরকারি অর্থ দু’টি তহবিলে জমা হয়, এর একটি হচ্ছে সংযুক্ত তহবিল অপরটি প্রজাতন্ত্রের সরকারি হিসাব। উভয় তহবিলের অর্থ ব্যয়ের পদ্ধতি আইন ও বিধিবিধান দিয়ে নিয়ন্ত্রিত।

রাষ্ট্রীয় কোষাগারে সংযুক্ত তহবিল ও প্রজাতন্ত্রের সরকারি হিসাব উভয় থেকে প্রাপ্ত অর্থ অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কোনও ব্যক্তির বিদেশে উন্নত চিকিৎসা গ্রহণের প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সমন্বয়ে গঠিত বোর্ড কর্তৃক প্রত্যয়ন আবশ্যক এই মর্মে যে, দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা দিয়ে চিকিৎসা সম্ভব নয় বিধায় উন্নততর চিকিৎসা গ্রহণের জন্য বিদেশে পাঠানো প্রয়োজন। এ ধরনের প্রত্যয়ন অবশ্যই বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণের আগে সংগ্রহ করতে হবে। কিন্তু এ বিধান অনুসরণ করে দেশের বিশিষ্টজনরা রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করেন কি না সে বিষয়ে সংশয় রয়েছে।

উচ্চ আদালতের বিচারকদের দেশের অভ্যন্তরে চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহের জন্য প্রতি বছর সংযুক্ত তহবিল থেকে চাহিদা অনুযায়ী অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়। এ বরাদ্দ থেকে অবসরে যাওয়া উচ্চ আদালতের বিচারক ও তাদের পোষ্যদের চিকিৎসা ব্যয়ও নির্বাহ করা হয়। এ খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় বিষয়ে প্রধান বিচারপতির অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তবলিগের অনুসারী শ্মশ্রুধারী কোনো এক প্রধান বিচারপতি পদে বহাল থাকাকালীন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের প্রত্যয়ন ছাড়া বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণ শেষে চিকিৎসাসংক্রান্ত যাবতীয় ব্যয় এবং তার নিজের ও পুত্রের বিমান ভাড়া অন্তর্ভুক্ত করে আইন ও বিধিবিধান দিয়ে অনুমোদিত না হওয়া সত্ত্বেও এ খাত থেকে ব্যয় দেখিয়ে সারসংক্ষেপ প্রস্তুত করে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদন নিয়েছিলেন। যেহেতু বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট থেকে আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছিল, তাই অনভিজ্ঞ প্রধান উপদেষ্টা আইনগত যথার্থতা যাচাই না করেই সারসংক্ষেপটি অনুমোদন করেছিলেন। আরো আশ্চর্যান্বিত হতে হয় যখন দেখা গেল, সারসংক্ষেপটি প্রচলিত নিয়মের ব্যত্যয় সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারের কার্যালয়কে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে তৎকালীন প্রধান বিচারপতির আস্থাভাজন আপিল বিভাগের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছিল। রেজিস্ট্র্রারের কার্যালয়কে অন্ধকারে রাখার কারণ তৎকালীন রেজিস্ট্রার হয়তো এ ধরনের আইনবহির্ভূত সারসংক্ষেপ পাঠাতে সম্মত হতেন না।

২০০৭ সালের ১৬ নভেম্বর সিডর-পরবর্তী তৎকালীন প্রধান বিচারপতির সভাপতিত্বে সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের বিচারকদের উপস্থিতিতে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, সুপ্রিম কোর্টের সব বিচারক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী এক দিনের মূল বেতন প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ তহবিলে দান করবেন। সিদ্ধান্ত মোতাবেক একজন বিচারক ছাড়া অপর সব বিচারক এবং সব কর্মকর্তা-কর্মচারী এক দিনের মূল বেতন যথারীতি প্রদান করলেন। সম্মিলিতভাবে সবাই দান করার এক সপ্তাহ পর দেখা গেল, অবশিষ্ট ওই বিচারক এক দিনের পরিবর্তে এক মাসের মূল বেতন ত্রাণ তহবিলে দান করলেন। এ ঘটনার পর দু’বছর অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই দেখা গেল, ওই বিচারক বিদেশে স্ত্রীর চিকিৎসার ব্যয় বাবদ প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে ১০ লক্ষাধিক টাকা গ্রহণ করেছেন। এ বিচারক পরে প্রধান বিচারপতি হয়েছিলেন। তিনি প্রধান বিচারপতি হওয়া পূর্ববর্তী এবং প্রধান বিচারপতি থাকাকালে ঢাকার বেইলি রোডের অফিসার্স ক্লাব মিলনায়তনে তার দু’পুত্রের বিবাহোত্তর সম্বর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়। বিজ্ঞজনদের মতে, প্রথম ও দ্বিতীয় অনুষ্ঠানে অভ্যাগতদের সংখ্যা এক ও দুই সহস্র্রাধিক ছিল। এ দু’টি অনুষ্ঠানে কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছিল তা অতি সহজেই অনুমেয়। দেশের বেশির ভাগ আইনজীবীর অভিমত, যিনি অপরকে উপদেশ দেয়ায় সিদ্ধহস্ত এবং যিনি উপরোল্লিখিত ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় বিত্তবান তিনি কি করে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে দুস্থ, অসহায় ও নিঃস্বদের পরিত্রাণের জন্য সঞ্চিত অর্থ গ্রহণ করতে পারেন?

এখানে প্রাসঙ্গিক যে, ১৯৯৬ সালে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ থেকে অবসরে যাওয়া বিচারক মো: বদরুজ্জামান ও তার স্ত্রী ২০০৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা গ্রহণের পর তাকে চিকিৎসাসংক্রান্ত দেড় লক্ষাধিক টাকার ব্যয়ভার প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে নিতে বলা হলে তিনি বিনয়ের সাথে তৎকালীন আইন সচিবকে বলেছিলেন, আমি নিজে যেহেতু জাকাত দিই তাই ত্রাণ তহবিলের টাকা আমার পক্ষে নেয়া সম্ভব নয়।

প্রখ্যাত আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক উল হক প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের টাকা নেয়ার বিষয়টিকে অনৈতিক, অনাকাক্সিক্ষত, বিস্ময়কর, অচিন্তনীয় ও অকল্পনীয় বলে উল্লেখ করেছেন (যুগান্তর ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১১)।

রাজধানী শহর ঢাকার অভিজাত এলাকা ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী, বারিধারা, ডিওএইচএস, উত্তরা প্রভৃতিতে সুরম্য অট্টালিকা রয়েছে এমন একাধিক রাজনীতিবিদ, পদস্থ সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা ও বিভিন্ন পেশাজীবী যাদের ছেলেমেয়েরা দেশে ও বিদেশে সুপ্রতিষ্ঠিত এবং যাদের নিজেদের দেশে ও বিদেশে বিপুল অর্থবিত্ত বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অনেকেই অবহিত, এমন ব্যক্তির মধ্য থেকে যখন কতিপয়ের ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে অর্থ গ্রহণের বিষয় শোনা যায় তখন হতবাক হয়ে নিজেকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে, এদের বিবেকবোধ কি এতই অন্ধ যে- অসহায়, দুস্থ ও নিঃস্বদের জন্য সংগৃহীত অর্থের ভাগিদার হতে কোনোভাবেই এরা কুণ্ঠিত নন!

প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে দেশের প্রতিটি নাগরিক সরকারকে কর দিয়ে থাকে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রাপ্ত করের অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে সঞ্চিত থাকে, যা সংযুক্ত তহবিল ও প্রজাতন্ত্রের সরকারি হিসাব সমন্বয়ে গঠিত। সরকারের প্রতিটি কার্যালয়, প্রতিষ্ঠান, মন্ত্রণালয়, বিভাগের বার্ষিক রাজস্ব ও উন্নয়ন ব্যয় বরাদ্দ অর্থবছরের শুরুতে চাহিদা অনুযায়ী উপরোক্ত তহবিল ও হিসাব থেকে দেয়া হয়। উন্নয়ন ব্যয়ের বিষয়ে ক্ষেত্রবিশেষে বৈদেশিক ঋণ ও সাহায্যের অর্থ অন্তর্ভুক্ত থাকে। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলের অর্থ জনগণের দান ও বৈদেশিক সাহায্যের মাধ্যমে সংগৃহীত বিধায় দেশের সর্বোচ্চ আইনের বিধান অনুযায়ী এ তহবিল প্রজাতন্ত্রের সরকারি হিসাবের অন্তর্ভুক্ত।

প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ বিধায় রাষ্ট্রীয় কোষাগার ও ত্রাণ তহবিলের অর্থ আইনসম্মতভাবে এবং বিধিবিধান অনুসরণ করে ব্যয় হচ্ছে কি না তা জানার অধিকার জনগণের রয়েছে। এ যাবৎকাল রাষ্ট্রীয় কোষাগার ও প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে উচ্চ পদমর্যাদাসম্পন্ন যেসব ব্যক্তি বিদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের নিমিত্তে অর্থ সাহায্য গ্রহণ করেছেন তাদেরই নিশ্চিত করতে হবে তাদের ওপর জাকাত ফরজ হয়ে থাকলে তারা উভয় তহবিল থেকে অর্থ গ্রহণে হকদার কি না? তাদের মধ্যে কেউ বেহকদার হয়ে থাকলে অনুশোচনা বা দুঃখ প্রকাশপূর্বক রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা ত্রাণ তহবিল থেকে গৃহীত অর্থ ফেরত দেয়ার অবকাশ আছে। অনেকে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন, বর্তমান বা সাবেক প্রধানমন্ত্রী উচ্চ পদমর্যাদসম্পন্ন ব্যক্তিদের বিদেশে চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহের জন্য বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণ পরবর্তী অর্থ প্রদান করে অন্যায় করেছেন কি না? এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, তারা উভয়ে বিরুদ্ধবাদীদের প্রতি কঠোর হলেও নিজ মতাদর্শের ব্যক্তি ও সাধারণ জনগণের প্রতি কোমল ও নমনীয়। সে বিবেচনায় ভবিষ্যতে উভয় তহবিল থেকে অর্থ বরাদ্দের বিষয়ে আইন ও বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করে প্রকৃত দুস্থ, অসহায় ও নিঃস্বদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে যেকোনো অনাকাক্সিক্ষত বিতর্ক পরিহার করা সম্ভব হবে।

লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here