আগামী সময় আমাদের, অতীতেরমত যুক্ত বাংলার সাম্রাজ্যবাদী নিডহ্যাম প্রশ্ন

আগামী সময় আমাদের, অতীতেরমত যুক্ত বাংলার
সাম্রাজ্যবাদী নিডহ্যাম প্রশ্ন এবং অনুগামী মেকলের নাতিনাতনিরা
আমরা আমাদের মত উন্নত ছিলাম ।। ইওরোপের নকল করেই চিত্তির
সর্বজনমান্য চিন বিশেষজ্ঞ, নিডহ্যাম, প্রশ্ন তুলেছিলেন এশিয়া যদিই এত উন্নত হবে তবে এশিয়াকে পিছনে ফেলে এগিয়ে গেল কেন ইওরোপ?
আজ দেখলাম অরুণ বালা আর প্রসেনজিত দুয়ারার সম্পাদনায় The Bright Dark Ages: Comparative and Connective Perspectives বইটি। এখনও পড়া হয় নি। আমার প্রিয় গবেষক কপিল রাজ বইটিতে Kapil Raj Rescuing Science from Civilisation: On Joseph Needham’s “Asiatic Mode of (Knowledge) Production” প্রবন্ধটা লিখেছেন। এটা বহু আগে থেকেই ছিল। আজ বইটা নামালাম। নিচে আমাদের সম্ভাব্য উত্তর পড়তে পারেন।
পশ্চিম নিয়ে আগাপাছতলা জ্ঞানওয়ালা ভদ্রবিত্তরা সক্কলে মনে করি এদেশে জন্মে পদাঘাতই শুধু পেলাম। ইওরোপে জন্মালে কিছু না কিছু হনু হতাম। ঔপনিবেশিক ইংরেজি শিক্ষিতরা, প্রত্যেক ইওরোপিয় বা আমেরিকিয়কে আদ্যন্ত ধর্মনিরপেক্ষ, মানবতাবাদী, তথাকথিত সুস্থ সংস্কৃতি চর্চক, দুষ্টের যম শিষ্টের পালক ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি অভিধা দিয়ে থাকি- ভদ্রবিত্তের মনে যত সদর্থক ভাবনা আছে(যার অধিকাংশ আবার ইওরোপিয় উৎপাদন) সেগুলো সব ক’টা একজন ককেসাসিয় সাদা চামড়ার মধ্যে বিদ্যমান এবং সেই জন্যে ইওরপিয় বিষয়ে অপ্রশ্ন ভদ্রবিত্ত তার পায়ে নত হয়। তারা যা বলেন তা আদতে হয় গীতা, বা কুরান বা বাইবেল বার্তার সামিল। ইওরোপিদ ভাবে দীক্ষায় দীক্ষিত উপনিবেশের মধ্যবিত্ত-ভদ্রদের কাজ ইওরোপের তৈরি ভারতীয় সমাজ বিশ্লেষণ, সমাজ বিকাশের ধারণা(যার অন্য নাম লুঠ, খুন আর ধ্বংস) সযত্নে সারা বিশ্বে প্রয়োগ করা – এবং সেই জন্য নানান বিশ্ববিদ্যালয়, নানান কারখানা, নানান স্বেচ্ছাসেবী-কর্পোরেট সংস্থায় ইংরেজি শিক্ষিত ভদ্রদের কাজ দিয়ে, দাসত্ব করিয়ে নেয় পশ্চিম।
এই তত্ত্ব ভাবতে ভাবতেই জনাব কবীর সুমনএর ফ্রান্স নিয়ে পোস্ট দেখলাম। তিনি বলছেন, হোলি গ্রেইল দখল করা নিয়ে ক্রুসেড শুরু। এই প্রবন্ধে অন্য সব কিছু নিয়ে সহমত হলেও জনাব ক্রুসেড নিয়ে যা বছেন তা পশ্চিমী জ্ঞানচর্চকদের তৈরি করা ইতিহাস। তিনি স্থিতধী জ্ঞানী মানুষ। তিনি হয়ত এই তুচ্ছ কথায় কান দেবেন না। তবুও বলা।
তাহলে সত্য কি?
আদিতে অসভ্য বর্বর ইওরোপিয়রা(সেদিনিকার লাতিন আমেরিকা লুঠ খুন, আফ্রিকার দাস ব্যবস্থা দেখুন, আজও লেভন্ট এলাকা দেখুন কিভাবে তারা বোমা ফেলছে, বিশ্বযুদ্ধগুলো দেখুন, কিভাবে মানুষ মেরেছে, ছিয়াত্তর-উনপঞ্চাশ দেখুন – আজও তারা খুনি অত্যাচারী কিন্তু বহিরঙ্গে দেখতে চকচকেমাত্র) এমন কিছুই উতপাদন করতে পারত না, যা তারা বিশ্ব বাজারে বিক্রি করতে পারে। এমন কোনো জ্ঞান ছিল না যা দিয়ে তারা সারা বিশ্বকে মুগ্ধ করতে পারত। ফলে কয়েক হাজার বছর ধরে তারা ভারত, পারস্য আর চীনের সমাজ-অর্থনীতির কাছে অধমর্ণ হয়েই ছিল।
সেই বাণিজ্য প্রবাহ ঘোরাতে ধর্মের নামে, মহান খ্রিস্টের নামে শুরু করেছিল ধর্মযুদ্ধ। সেই যুদ্ধে আরবে, পারস্যে প্রচুর গ্রন্থাগার পোড়ায়, প্রচুর বই লুঠ করে নিয়ে যায় ইওরোপে। ভারত, চিন থেকে, পারস্য থেকে ইওরোপ থেকে হঠিয়ে দেওয়া জেসুইট পাদ্রিরা ইওরোপের হয়ে জ্ঞান নকল করতে থাকেন। আরব-পারস্যে যুদ্ধে গিয়ে ইওরোপিয়রা বুঝতে পারের তারা কত তুশ্চু। তারা ঠিক করল সারা বিশ্বের জ্ঞান লুঠ করবে সম্পদের সঙ্গে।
ঠিক এই কাজটি চীনে করেছিলেন তার অনেক পরে ঘোমটা পরা সামাম্রাজ্যবাদী নিডহ্যাম – যিনি চিনের নানান প্রযুক্তি, নানান পরম্পরার কিছু নথিকরণ করেন। তাঁর প্রশ্ন ছিল, চিন(আমরা ধরেই নিচ্ছি তার সঙ্গে উপমহাদেশ, পারস্য, আরব ইত্যাদি অঞ্চল) যদি এতই উন্নত হবে, তাহলে আধুনিক কালে এশিয়া ইওরোপের থেকে পিছিয়ে কেন?
তিনি হয়ত জানতেন না কোপার্নিকাসের বিশ্ব মডেল আরব থেকে নেওয়া, যা আরব-ভারতের জ্ঞানীরা বহু হাজার বছর ধরে বিকশিত করেছিল, কলণবিদ্যা গিয়েছিল কেরল থেকে যা পরে ইওরোপে গিয়ে নিউটনিয়ন অঙ্ক হয়েছে, শূন্য সহ সংখ্যা বীজগণিত পাটিগণিত আর ত্রিকোনোমিতি গিয়েছিল এশিয়া থেকে – বর্বর ইওরপিয়রা শূন্যের প্রয়োগ শুরু করেছে শতিনেক বছর আগে মাত্র – চার্চ একে বলত শয়তানের দোসর – তারা বড় অঙ্ক করবে কি করে।
আমরা যেন মনে রাখি ক্রুসেডের সময় বা পলাশীর কিছু সময় পর্যন্ত বিশ্বকেন্দ্র ছিল এশিয়া, বলা দরকার বাংলা।তার নিজস্ব ছিল উৎপাদন প্রক্রিয়া যার ফল নিজের জ্ঞান, নিজেদের দক্ষতা, নিজেদের প্রযুক্তি আর বাজার। কেন এশিয়ার নানান দেশে শিল্প বিপ্লব হল না, তাই নিয়ে শিক্ষিত বামেদের প্রচণ্ড মাথা ব্যথা – আমরা বলি আমরা লুঠেরা এই উতপাদন ব্যবস্থা তৈরি করতে চাই নি, যে উৎপাদন ব্যবস্থার রেশ আমরা আজও গ্রামীন অর্থনীতিতে খুঁজেপাই। এশিয়া ইওরোপিয় উৎপাদন ব্যবস্থার বাইরে দাঁড়িয়ে একদা বিকশিত হয়েছে। আজ নকল করতে গিয়েই চিত্তির।
ধর্মযুদ্ধ ইওরোপকে দেখাল তারা বিশ্বে একটা প্রান্তিক শক্তি – জ্ঞানে আর সম্পদেও – তাই বিশ্ব লুঠের ছক। সেই থেকে শুরু আমেরিকা আফ্রিকা এশিয়াকে পদানত করার উদ্যম। এশিয়াকে উপনিবেশ বানাতে প্রথমে পর্তুগিজরা চেষ্টা করেছে, ফরাসীরা চেষ্টা করেছে, ডাচেরা করেছে পারেনি, সেই কাজটি ইওরোপের হয়ে পলাশীতে সম্পাদন করল ব্রিটিশরা। ধর্মযুদ্ধে যে প্রবণতা শুরু সেই প্রবণতাটি রূপ পেল পলাশীর পর। অধমর্ণ ইওরোপ এশিয় লুঠের সম্পদে আজকের চকচকে রূপ ধারণ করেছে।
ফলে বন্ধুরা আমরা কারিগরেরা বিশ্বাস করি চাষে এই বিষ খাওয়ানো, আকাশ বাতাসে বিষাক্ত ধোঁয়া ছাড়া কারখানাগুলোমানুষের অচাহিদার কাছে পরাস্ত হতে বাধ্য।
নিডহ্যাম জানতেন না, এশিয়রা একটু ল্যাদ খাওয়া সমাজ। তারা খরগোস আর কচ্ছপের দৌড়ে কচ্ছপের দৃষ্টিতেই জীবন দ্যাখে। এবং শেষ পর্যন্ত কচ্ছপই জিতে যায়। আগের হাজার হাজার বছর আমরাই ঢিমে তালে বিশ্বকে চালিয়েছি, আগামী বছরগুলোকেও সেই ভাবে চালাব। লুঠেরা শিল্পবিপ্লব মাত্র আড়াইশ বছরের গল্প – এই সময়টা তাদের দৌড়ে বেড়াবার।
তারপরের সময় আমাদের, যুক্ত বাংলার।
এটাই বাস্তব।
জয় বাংলা!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here